রবিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভোলার নদীতে মা ইলিশ শিকার, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

আশিকুর রহমান শান্ত
অক্টোবর ১৮, ২০২৬ ৩:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মেঘনা-তেঁতুলিয়ায় অব্যাহত মাছ ধরা; অভিযানে আটক, জরিমানা ও কারাদণ্ড, তবু উদ্বেগে ইলিশের প্রজনন। ছবি: সমতল মাতৃভূমি

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে চলছে মা ইলিশ শিকার। মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান, জেলেদের আটক, জরিমানা ও কারাদণ্ডের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নদীতে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ হচ্ছে না। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির আওতায় গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে নদীর অভয়াশ্রমসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার কথা। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের ঘটনা অব্যাহত থাকায় কর্মসূচির সফলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অভিযানে আটক অর্ধশতাধিক জেলে

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের পরিচালিত অভিযানে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত অর্ধশতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। এসব অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫১টি মামলা দায়ের, ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন জেলেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অভিযানে উদ্ধার করা ইলিশ বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ ৭০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। বেশ কিছু নৌকা আটক করে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন।

এর আগে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৃথক অভিযান পরিচালনা করে।

ভোলা সদর উপজেলায় ১৭ জন জেলেকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের জেল-জরিমানা করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় তিনটি নৌকা, ১০ কেজি ইলিশ ও ২৫ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়।

দৌলতখান উপজেলায় তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি একটি নৌকা, ১৫ কেজি ইলিশ ও ১ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।

তজুমদ্দিন উপজেলায় ১০ জন জেলেকে আটক করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের কাছ থেকে দুটি নৌকা, ছয় কেজি মাছ ও ২০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চরফ্যাশন উপজেলায় আটক আটজনের মধ্যে ছয়জনকে কারাদণ্ড এবং দুজনকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়। এ সময় ১০ কেজি ইলিশ ও ২২ হাজার মিটার জাল উদ্ধার করে পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ।

নিবন্ধিত জেলে ১ লাখ ৬৭ হাজার, চালের সহায়তা পাচ্ছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাতটি উপজেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। তবে চলতি বছরের ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলের জন্য ৩ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪ টন খাদ্যসহায়তার চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে ভোলা সদরে ৫২৫ টন, দৌলতখানে ৫০০ টন, বোরহানউদ্দিনে ৪৩০ টন, তজুমদ্দিনে ৪৩২ দশমিক ৫ টন, লালমোহনে ৫২৫ টন, চরফ্যাশনে ৮৯১ দশমিক ৪ টন এবং মনপুরায় ২৮৭ দশমিক ৫ টন চাল রয়েছে।

প্রতিজন জেলের জন্য ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ থাকলেও নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ২৩ হাজার ৬৫৬ জন এ বছরের সরকারি সহায়তার তালিকায় নেই। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বরাদ্দ করা চালের ৫০ শতাংশ ইতিমধ্যে জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

নিবন্ধনের বাইরে বিপুলসংখ্যক জেলে

ভোলার সাতটি উপজেলার নদীবেষ্টিত এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় তিন লাখ জেলে। অথচ সরকারি নিবন্ধনের খাতায় রয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। ফলে বিপুলসংখ্যক জেলে নিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

উপজেলাভিত্তিক নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ভোলা সদরে ২২ হাজার ২৫২, দৌলতখানে ২১ হাজার ৫০২, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৩৫০, তজুমদ্দিনে ১৮ হাজার ৭১৭, মনপুরায় ১৬ হাজার ৪০০, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ এবং চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ২৮৫ জন।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে সরকারি খাদ্যসহায়তা তাঁদের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু নিবন্ধিত হয়েও সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন অনেকে।

স্থানীয় মাঝিরা জানান, সরকার প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলে জেলেরা জীবিকার সংকট সত্ত্বেও তা মেনে চলেন। কিন্তু তাঁদের দুর্দশার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। অনেক জেলে চার-পাঁচ বছর আগে জেলে কার্ড পেয়েও এখন পর্যন্ত সরকারি চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। প্রতি বছর চাল পাওয়ার আশায় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে তাঁদের খালি হাতে ফিরতে হয়। পরিষদ থেকে জানানো হয়, সবার নামে বরাদ্দ আসেনি। ফলে ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হচ্ছে তাঁদের।

২২ দিন আয় বন্ধ, কিস্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা

ভোলার ধনিয়া ইউনিয়নের নাছির মাঝি মাছঘাট এলাকার জেলে ফারুক মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরতে না পারায় তাঁদের কোনো আয় থাকবে না। এ সময়ে পরিবারের খরচ চালানো এবং এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করা নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

তিনি বলেন, জেলেদের অনেকেই এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জাল-নৌকা কিনেছেন। মাছ ধরতে না পারলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন এনজিও ও ব্যাংকের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা।

কঠোর অভিযানের আশ্বাস মৎস্য বিভাগের

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এ বছর দ্রুত সময়ের মধ্যে চাল বিতরণের কাজ করা হচ্ছে। কোনো জেলে যেন ওজনে চাল কম না পান, সে জন্য মৎস্য বিভাগের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

তিনি আরও জানান, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন এনজিওগুলোর কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। মৎস্য অভিযানে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও ইলিশের প্রজনন সফল করতে সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

মৎস্য কর্মকর্তার আশা, নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে আগামীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে তা ভূমিকা রাখবে।

তবে নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের ঘটনা অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, অবৈধ মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে কি না এবং সহায়তা থেকে বঞ্চিত জেলেদের দুর্ভোগ কীভাবে কমানো হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্থানীয়রা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।