সোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাহাড়ি ছড়া-নদীতে বালুখেকো চক্রের থাবা, হুমকিতে শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতি ও জননিরাপত্তা

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজারে) প্রতিনিধি
জুন ৭, ২০২৬ ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া ও নিকটবর্তী নদী থেকে অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু সংগৃহীত

সমতলের নদী, খাল ও জলাশয়ের বুক চিরে বালু লুটের যে চিত্র এতদিন দেখা গেছে, এবার সেই দখলদারির ছায়া নেমে এসেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া ও নদীগুলোতে। দুর্গম টিলা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পাহাড়ি ছড়া, নদী ও উর্বর কৃষিজমি থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করছে সংঘবদ্ধ বালুখেকো চক্র। প্রশাসনের একের পর এক অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শুধু সরকার বছরে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে না, বরং ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তার ওপরও বাড়ছে হুমকি।

চার দিনে জব্দ ১০ হাজার ঘনফুট বালু

সর্বশেষ চার দিনের অভিযানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে শনিবার পরিচালিত অভিযানে এক হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভূনবীর ইউনিয়নের তিনটি স্থানে অভিযান চালিয়ে আরও ছয় হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। একই সময়ে আরও দুই হাজার ঘনফুট বালু উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০ জনকে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ ও কালাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক এক্সক্যাভেটর (ভেকু) মেশিন জব্দ  ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু বিনষ্ট করা হয়েছে।

বালু ঘিরে বাড়ছে সংঘাত, আহত ৬

অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশ নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও অস্থির করে তুলছে। প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা ও সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে।

শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় সেটি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত টমটমকে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন।

আহতরা হলেন—শিপন মিয়া, রাসেল, গিয়াস মিয়া, রুবেল মিয়া, জাকির মিয়া ও মারজান আহমেদ।

ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়না গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ফলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন।

অবৈধ বালু উত্তোলনে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

গত ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ফেরদৌস মিয়া, আহাদ মিয়া, কাওছার মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, ফয়েজ মিয়া, মোচ্ছাব্বির মিয়া, মাসুক মিয়া, লোকমান মিয়া, মো. আব্দুল্লাহ, মকবুল মিয়া, কদর আলী, নানু মিয়া, দুদু মিয়া, সামছু মিয়া, বেলাল মিয়া, আছলাম মিয়া, কবির মোল্লা, লতিফ মিয়া ও আজাদ মিয়া। তাদের অধিকাংশের বাড়ি ভূনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।

মামলায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এখন এটি চলবে না।

ঝুঁকিতে ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া

শ্রীমঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, সিন্দুরখান চা বাগান, কুঞ্জবন, কামারগাঁও ও চিরিগাঁও এলাকায় একাধিক পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন চলছে। একইভাবে মটুলির পাড় এলাকায় পুটিয়া ছড়া থেকেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাশ নদীর পাড়, সাতগাঁও ইউনিয়নের মাকরী ছড়া, গান্ধিছড়া ও ইছামতিছড়া, ভূনবীর ইউনিয়নের জয়িতাছড়া, মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া ও বৌলাছড়া, কালাপুর ইউনিয়নের শিয়ালছড়া, নারাইনছড়া ও জাগছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন।

প্রকৃতির বিরুদ্ধে নীরব যুদ্ধ

প্রকৃতির বুক চিরে বালু উত্তোলনের এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি অবৈধ ব্যবসা নয়, এটি শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি পরিবেশের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ। প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ, বদলে যাচ্ছে ভূপ্রকৃতি, বাড়ছে ভূমিধস ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা।

প্রশাসনের অভিযান চললেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—কতদিনে থামবে বালুখেকোদের এই দৌরাত্ম্য? নাকি পাহাড়ি ছড়াগুলোর অস্তিত্ব সংকট আরও গভীর হওয়ার পরই মিলবে স্থায়ী সমাধান?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।