কামরুল–ফিরাদুলের বিরুদ্ধে কাজ খণ্ডিত করে RFQ, ভাউচার ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগের আদ্যোপান্ত। ফাইল ছবি
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি-বিধান ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। দাপ্তরিক নথিপত্র ও কেনাকাটার হিসাব বিশ্লেষণে প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকার এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হক।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে কাজ খণ্ডিত করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া, RFQ পদ্ধতিতে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এবং সরাসরি ভাউচার ও নগদ কেনাকাটার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের অর্থবছরে ফেরত যাওয়া প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল পরবর্তী অর্থবছরে পুনরায় পাস করিয়ে অর্থ উত্তোলনেরও অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিপিআর-২০২৫-এর RFQ পদ্ধতিতে বাৎসরিক ক্রয়ের নির্ধারিত সীমা ৩০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথিতে RFQ খাতে মোট ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, একই ধরনের কাজ বা ক্রয়কে বারবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে RFQ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে বিধিমালা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিউ বাকেরগঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরজে কনস্ট্রাকশন, সেলভিশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ভাউচারের আড়ালে আরও দুই কোটি টাকার অভিযোগ
শুধু RFQ নয়, সরাসরি ভাউচার বা নগদ কেনাকাটার ক্ষেত্রেও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকৃত হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি ভাউচারের মাধ্যমে ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত নির্ধারিত ১০ লাখ টাকার সীমা বিবেচনায় নিলে এখানে ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ দাঁড়ায়।
কম্পিউটার সামগ্রী, সেমিনারের ব্যাগ, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী এবং যানবাহন মেরামতের মতো বিভিন্ন খাতে শত শত ভাউচার তৈরি করে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ব্যয়ের বড় অংশে যথাযথ প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
সরকারি e-GP বা উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগকে ঘিরে তাই প্রশ্ন উঠেছে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়েও।
ফেরত যাওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল ফের পাসের অভিযোগ
এরই মধ্যে গত অর্থবছরের RFQ খাতের আরও ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া নথিতে দাবি করা হয়েছে, এসব বিলের দাপ্তরিক ভিত্তি ও বিধিসম্মত প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি থাকায় হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে বিলগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে মো. কামরুল হাসান সরকার ও মো. ফিরাদুল হক পরস্পর যোগসাজশে ওই বিলগুলো চলতি অর্থবছরে পুনরায় পাস করিয়ে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন। এমনকি আগের অর্থবছরে আটকে থাকা ওই অর্থ পরবর্তী অর্থবছরে সরকারি অর্থ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ করে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার ওই বিল মো. কামরুল হাসান সরকারের পাওনা হিসেবে দেখিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে—এমন তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় নিয়ে কামরুলের বক্তব্য
পিপিআরবহির্ভূত কেনাকাটা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি গত অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে এ দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন বলে জানান। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথিতে ওই সময়ের কেনাকাটার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হকের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তাকে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
মহাপরিচালকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুবের কাছে গত অর্থবছরের কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত অর্থবছরে RFQ-তে যে পরিমাণ কোটা ছিল, সেই পরিমাণই ব্যয় করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া হিসাব ও নথির সঙ্গে তার বক্তব্যের ভিন্নতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর স্থগিত হওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল চলতি অর্থবছরে উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক প্রথমে বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই; জেনে জানাবেন।
পরবর্তীতে লিখিত জবাবে তিনি জানান, স্থগিত থাকা বিলগুলোতে হিসাবরক্ষণ অফিসের আপত্তি ছিল না। বরং বরাদ্দ সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বকেয়া দায় হিসেবে পরবর্তী বছরের বাজেট থেকে সরকারি নিয়ম ও জিএফআর-এর বিধান মেনে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
RFQ খাতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক জানান, পিপিআর-২০০৫ অনুযায়ী RFQ সীমার মধ্যে থেকে আলাদা অর্থনৈতিক খাতে বিভিন্ন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর RFQ কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বা OTM পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নগদ ও সরাসরি ক্রয়ের বিষয়ে মহাপরিচালকের বক্তব্য, ভাউচার বা নগদ ক্রয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং প্রয়োজনে Direct Contracting Method (DCM) প্রযোজ্য। তার দাবি, বিপিপিএর অনুমোদনক্রমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাজ হলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সব ক্রয় e-GP পদ্ধতিতে করা হবে।
‘কাজ খণ্ডিত করা হয়নি’—দাবি কর্তৃপক্ষের
কার্য খণ্ডিতকরণ ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, অহেতুক প্যাকেজ বিভাজন এড়াতে ছয়টি কাজ OTM পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে RFQ-তে নতুন কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অনুসন্ধান ও নথিপত্র বিশ্লেষণে উঠে আসা হিসাব অনুযায়ী, RFQ খাতে অতিরিক্ত ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, সরাসরি ভাউচারে অতিরিক্ত ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং পূর্বে ফেরত যাওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল—এই তিন খাত মিলিয়ে মোট ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কাজ না করেই বা যথাযথ কাজের প্রমাণ ছাড়াই সরকারি অর্থ ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, এর পেছনে দুই সহকারী পরিচালকের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন দাপ্তরিক নথি, বিল-ভাউচার, কার্যাদেশ, সরবরাহের প্রমাণ, হিসাবরক্ষণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই। সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগ থাকায় বিষয়টি দ্রুত তদন্তের আওতায় এনে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
