মাত্র ১৫ দিনের ছুটি মঞ্জুর করাতে গিয়ে একই তারিখের দুই হাসপাতালের চিকিৎসা সনদ ও ব্যবস্থাপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুবেল হোসেনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তার বেতন-ভাতা স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
অভিযোগ উঠেছে, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ছুটি বৈধ করার জন্য চিকিৎসার বিষয়টি সামনে এনে দুই ভিন্ন হাসপাতাল থেকে একই তারিখের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন ওই শিক্ষক। এ ঘটনায় সরকারি চাকরির বিধিবিধান ও ছুটি গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক রুবেল হোসেন কাশিয়ানীর ১৬ নম্বর জাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি সাজাইল ইউনিয়নের হরিদাসপুর গ্রামের মো. হুমায়ুন কবিরের ছেলে।
১৫ দিন অনুপস্থিত, প্রধান শিক্ষককে জানাননি
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সহকারী শিক্ষক রুবেল হোসেন গত ১৯ জুন থেকে প্রায় ১৫ দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি নিজে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করেননি। পরে তার স্ত্রী মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষক অশিত রঞ্জন ঘোষালকে জানান, রুবেল হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে বারবার তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সফল হননি বলে জানা গেছে।
একই তারিখে দুই হাসপাতালের চিকিৎসা সনদ
এরপর রুবেল হোসেনের স্ত্রী, উপজেলার ২৪ নম্বর হরিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইমা খানম, একটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র জমা দেন। সেখানে উত্তরা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে ২১ জুন ২০২৬ তারিখে চিকিৎসা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের দুটি সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে এবং ১৫ দিনের বিশ্রামের পরামর্শসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এর এক দিন পরই একই ২১ জুন ২০২৬ তারিখে কাশিয়ানী ১০০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফার স্বাক্ষরিত আরেকটি চিকিৎসা সনদ জমা দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, রুবেল হোসেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে ১৫ দিনের ছুটি মঞ্জুরের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯ জুন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে জমা দেওয়া দুই হাসপাতালের কাগজপত্রেই চিকিৎসা নেওয়ার তারিখ হিসেবে ২১ জুন উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
‘মানবিক কারণে সনদ দিয়েছি’: চিকিৎসক
এ বিষয়ে কাশিয়ানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, রুবেল হোসেনের স্ত্রী অনুনয়-বিনয় করায় তিনি সনদটি দিয়েছেন।
তার ভাষ্য, যেহেতু বিষয়টি একজন সরকারি চাকরিজীবীর ছুটির সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনি একটি সনদ দিয়েছেন—যাতে ওই শিক্ষকের ছুটি মঞ্জুর হতে পারে।
অন্যদিকে উত্তরা জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্রে থাকা নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
প্রধান শিক্ষক: ‘দুই হাসপাতালের কাগজ জমা দিয়েছে’
ঘটনার বিষয়ে ১৬ নম্বর জাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশিত রঞ্জন ঘোষাল বলেন, সহকারী শিক্ষক রুবেল হোসেন প্রায় ১৫ দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। ছুটি মঞ্জুরের জন্য তিনি একটি আবেদন এবং একই তারিখের দুই হাসপাতালের চিকিৎসা সনদ ও ব্যবস্থাপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি জানান, ওই কাগজপত্র উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সন্দেহ হওয়ায় বেতন-ভাতা স্থগিত
কাশিয়ানী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উত্তম কুমার সরকার বলেন, ঘটনাটি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা স্থগিত রাখা হয়েছে এবং সব কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যাচাইয়ে বের হবে আসল তথ্য
একজন সরকারি শিক্ষকের ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্রের সত্যতা ও সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একই তারিখে দুই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রকৃত সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের পরই স্পষ্ট হবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরির বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো চিকিৎসা সনদ বা নথি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
এখন মূল প্রশ্ন—১৫ দিনের ছুটি মঞ্জুর করাতে একই তারিখে দুই হাসপাতালের চিকিৎসা নথি কীভাবে এলো? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? কর্তৃপক্ষের তদন্তেই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর।
