‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন’-এর নামে ৪ কোটি ভাগ ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে, বাকি ৫ কোটি নিয়ে প্রশ্ন—সিসিটিভিতে দুই কর্মকর্তার টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। ফাইল ছবি
দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টানা যায়নি। এবার ‘প্রণোদনা’র নামে ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে জুন মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উঠে এসেছে, ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় ১৩ কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রধান শাখায় আনা আরও ৫ কোটি টাকা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ ঘটনায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িত ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) মো. হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের ভূমিকা।
তবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক দাবি করেছেন, পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক অনুমোদন নিয়েই কাজটি করা হয়েছিল। পরে লিখিত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় ২৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নতুন আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ নির্ধারিত ছিল চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত। পরে মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু এই বাড়তি সময়ের জন্য পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল না।
এরপরও সেই মেয়াদকে আমলে নিয়ে ১৩ কর্মকর্তাকে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের বিপরীতে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৪ টাকা করে প্রণোদনা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, ১৪টি চেকের মাধ্যমে ওই ৪ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জুন ৯টি চেকে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ৭ জুন ৫টি চেকে ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
প্রণোদনার অর্থ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ৮০ লাখ টাকা, এফএভিপি মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ ৮০ লাখ টাকা, এভিপি সালেহ আহমেদ ২০ লাখ টাকা, অফিসার মো. সরোয়ার ৮ লাখ টাকা এবং এফএভিপি সুজন দাস ৮ লাখ টাকা। এভিপি তাশনুভা মজুমদার, মো. আহসান হাবীব ও পিও মো. আদনান শফিক—প্রত্যেকে পেয়েছেন ৪০ লাখ টাকা করে।
এ ছাড়া মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল হক, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর রহমান ও শাহিনুর রহমানও ওই তালিকায় রয়েছেন।
চেক একদিকে, টাকা অন্যদিকে
কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের স্বাক্ষর করা চেক মার্কেটিং বিভাগে দেওয়া হয়েছিল। টাকা উত্তোলনের সময় তারা শাখায় উপস্থিত ছিলেন না বলেও দাবি করেছেন তারা। তাদের চেক ‘বেয়ারার’ বা বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করে টাকা তোলা হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
তবে বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা ব্যাংকের সংরক্ষিত চেক পরীক্ষা করে দেখতে পান, চেকের পেছনে কোনো ব্যক্তির নাম বা স্বাক্ষর নেই। ফলে টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সিসিটিভিতে দুই কর্মকর্তার ‘টাকা নিয়ে’ বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ জুন বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনা ৫ কোটি টাকা কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখার ভল্টে রাখা হয়। পরে সেই টাকা ছয়টি পাটের বস্তায় প্যাকেট করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন ছয়টি বস্তা খুলে টাকা গ্রহণ করেন। এরপর ওই দুই কর্মকর্তা ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা নিয়ে কালো রঙের একটি গাড়িতে করে শাখা ত্যাগ করেন।
এর তিন দিন পর, ৭ জুন ওই দুই কর্মকর্তা আরও ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করে শাখা থেকে বেরিয়ে যান। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে তাদের মাধ্যমে মোট ৪ কোটি টাকা শাখা থেকে বের হয়ে যায়।
ব্যাংকের গাড়ির লগবুক, সিসিটিভি ফুটেজ ও চালকের বক্তব্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও দেখতে পায়, ৪ জুন ওই গাড়িতে করে দেলোয়ার হোসেন ও হামিদুর রহমান উত্তরা ক্লাবে এবং ৭ জুন গুলশান ক্লাবে যান।
লেজারে পোস্টিং সন্ধ্যায়, নগদ টাকা বের দুপুরেই
পরিদর্শনে আরও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। ৪ জুন দুপুর দেড়টায় ৪ কোটি টাকা নগদ লেনদেন করা হয়। ওই সময় অগ্রিম ব্যয় দেখিয়ে ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে অর্থ দেওয়ার জন্য টাকা ইস্যু করা হয়।
কিন্তু ব্যাংকের লেজারে ওই লেনদেনের পোস্টিং করা হয় সন্ধ্যা ৭টায়। অর্থাৎ হিসাবের লেনদেন সম্পন্ন করার আগেই নগদ অর্থ তুলে নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে এ ঘটনাকে গুরুতর আর্থিক ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি যে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়, তারও তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এর আগেও ব্যাংকের প্রধান শাখার সাসপেন্স হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে ২৯টি এন্ট্রির মাধ্যমে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব অর্থ ব্যবসা উন্নয়ন ও আমানত সংগ্রহের ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগ বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষাও করে।
দেলোয়ারের বিরুদ্ধে আগের অনিয়মের তথ্যও প্রতিবেদনে
বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের প্রধান শাখায় দায়িত্ব পালনের পর তিনি ব্যবসা উন্নয়নের নামে সাসপেন্স খাত থেকে বিভিন্ন সময়ে ১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা-১-এর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দেলোয়ার হোসেনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ওই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, দেলোয়ার হোসেন ব্যাংকের ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি ৭ লাখ ৩ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের সোয়েটার যুক্তরাজ্যে রপ্তানির পর সেই অর্থ দেশে ফেরত না আনার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ জুলাই মামলাটি করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের দায়ে দেলোয়ার হোসেন এনআরবিসি ব্যাংক থেকে চাকরি হারিয়েছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংকে চাকরির অযোগ্য হলে অন্য ব্যাংকে চাকরি করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই নিয়ম অমান্য করে তাকে কমার্স ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এ অবস্থায় মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. হামিদুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্তসহ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদ: পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও অনিয়ম বন্ধ হয়নি
ব্যাংকিং খাতে এমন ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি এখনো চলছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম বন্ধ হবে না।
এমডির দাবি, ছিল পর্ষদের মৌখিক অনুমোদন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক বুধবার টেলিফোনে বলেন, ‘যেভাবে আপনারা বলছেন বিষয়টা ওইভাবে না। পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক অনুমতি নিয়ে কাজটা করা হয়েছে। পরে তারা লিখিত অনুমোদন দিয়েছেন। সামনাসামনি কথা বললে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংকের গাড়ির লগবুক, চালকের বক্তব্য এবং হিসাবের নথিতে উঠে আসা এসব তথ্যের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির নামে দেওয়া ৪ কোটি টাকার প্রণোদনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনা ৫ কোটি টাকার ব্যবস্থাপনায় আসলে কী ঘটেছিল? আর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই বা কেন এমন গুরুতর অনিয়ম ঠেকাতে পারল না?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
