কারওয়ান বাজারে কম, হাতিরপুল-কাঁঠালবাগানে বেশি—বাড়ছে ডিম-মুরগি-মাছের দাম, শনিবার থেকে ২০% বাড়ছে বেকারি পণ্য। ফাইল ছবি
রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি কাঁকরোল ৮০ থেকে ৯০ টাকা, উচ্ছে ও ঝিঙা ৯০ টাকা এবং পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁঠালবাগান কাঁচাবাজারেও প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে এসব সবজি। অথচ এই দুই বাজার থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরের কারওয়ান বাজারে একই সবজি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাজার তিনটি ঘুরে এমন দামের বিস্তর ফারাক দেখা গেছে। একই শহর, কাছাকাছি তিন বাজার—অথচ একই সবজির দামে কেজিতে পার্থক্য ৩০ টাকা পর্যন্ত। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত স্বল্প দূরত্বে বাজারভেদে দামের এই বড় ব্যবধানের কারণ কী?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনে তার সঙ্গে পরিবহন, দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে অন্য বাজারে দাম নির্ধারণ করতে হয়। হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানের বিক্রেতাদের দাবি, তারা কারওয়ান বাজার থেকে বাছাই করা ভালো মানের সবজি কিনে আনেন। এ কারণেও তাদের ক্রয়মূল্য কিছুটা বেশি পড়ে।
হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানে সবজির দর
গত বুধবার হাতিরপুল বাজারে প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ৯০, ঢ্যাঁড়শ ৬০ থেকে ৭০, চিচিঙ্গা ৬০ থেকে ৭০, ধুন্দল ৬০ থেকে ৮০, বরবটি ১০০ থেকে ১২০, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০, আলু ৩০ এবং কাঁচামরিচ ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও দর মোটামুটি একই ছিল।
গত দুদিন কাঁঠালবাগানেও সবজির দাম প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। যদিও দু-একটি সবজির দামে পাঁচ থেকে ১০ টাকা তারতম্য ছিল। যেমন, কাঁঠালবাগানে ঢ্যাঁড়শ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও হাতিরপুলে একই সবজির দাম ১০ টাকা বেশি।
একই সবজি কারওয়ান বাজারে কত
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁকরোল ৫৫ থেকে ৬০, উচ্ছে ও ঝিঙা ৬০ থেকে ৭০ এবং পটোল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ৯০, গোল বেগুন ১০০ থেকে ১২০, ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৫০, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ৫০ থেকে ৬০, বরবটি ৮০ থেকে ৯০, পেঁপে ২০ থেকে ৩০, আলু ২৫ এবং কাঁচামরিচ মানভেদে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
অর্থাৎ কারওয়ান বাজারের তুলনায় হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানে প্রতি কেজি সবজির দর সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেশি।
দামের ফারাক এত বেশি কেন
কারওয়ান বাজার থেকে কাঁঠালবাগান বাজারের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার আর হাতিরপুল দুই কিলোমিটার। এত অল্প দূরত্বে দামে এত বেশি ফারাক কেন—এ প্রশ্নের জবাবে হাতিরপুল বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কারওয়ান বাজার থেকে হাতিরপুলে সবজি আনতে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলে তাঁর অতিরিক্ত খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা।
এক কেজির কচুরলতির আঁটি দেখিয়ে তিনি বলেন, এই লতি কিনতে হয়েছে কেজি ৮০ টাকা দরে। রং নষ্ট ও কিছুটা পচে যাওয়ার কারণে এখন কেউ ৪০ টাকায়ও নিতে চায় না। এভাবে প্রতিদিনই কিছু সবজি অবিক্রীত থেকে পচে যায় এবং সেগুলো ফেলে দিতে হয়।
তাঁর দাবি, ওই এলাকার প্রায় সব ক্রেতাই তরতাজা ও ভালো মানের সবজি কিনতে চান।
দোকান ভাড়াও সবজির দামে প্রভাব রাখে উল্লেখ করে হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁর তিন বাই পাঁচ ফুটের দোকানের মাসিক ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। ছেলেকে নিয়ে দোকান চালান। সব খরচ হিসাব করলে খুব বেশি লাভ থাকে না।
কাঁঠালবাগানের সবজি ব্যবসায়ী মো. সজীব জানান, কারওয়ান বাজার থেকে সবজি নিতে হলে ভ্যান ভাড়া, সবজি কেনার পর যেখানে রাখা হয় সেই ফুটপাতের ভাড়া, কুলি খরচসহ বিভিন্ন খাতে এক হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। এই টাকা সবজি বিক্রি করে তুলতে হয়।
একই বাজারের মো. রকির দাবি, কারওয়ান বাজার থেকে বেশি দরে কিনে কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই। তাঁর মতে, কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা সেখান থেকেই পাইকারি দরে কিনে একই বাজারে খুচরায় বিক্রি করেন। তাদের পরিবহন খরচ নেই। তাই তারা কিছুটা কম দামে সবজি বিক্রি করতে পারেন।
তবে চাঁদাবাজির প্রতি ইঙ্গিত করে কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, তারা কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনলেও তাদের অঘোষিত কিছু খরচ আছে। এরপরও তারা কম দামে বিক্রি করার চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ থেকে ট্রাকে সবজি এনে ঢাকায় পাইকারি বিক্রি করেন ব্যাপারী নুর হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, সাধারণত দূরের বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা রাতের প্রথম ভাগে সবজি কেনেন। তখন সবজিগুলো তাজা থাকে। দামও কিছুটা বেশি থাকে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা সকালের দিকে সবজি কেনেন। এ কারণে তারা কিছুটা কম দামে কিনতে পারেন। তবে কারওয়ান বাজারের সঙ্গে হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানের সবজির দামে ২০ থেকে ৩০ টাকা ব্যবধান অনেক বেশি বলে মনে করেন তিনি।
ডিম-মুরগির দামও বাড়তি
এক থেকে দেড় মাস ধরে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম ও মুরগি। ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ এবং সোনালি জাতের মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উল্লিখিত তিন বাজারেই প্রোটিনজাতীয় খাদ্যপণ্য দুটির দাম প্রায় কাছাকাছি রয়েছে। পাশাপাশি মাছের বাজারও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী দেখা গেছে। রুই-কাতলা, পাঙাশ ও চাষের কইয়ের দাম এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে।
রুটি-বিস্কুটের দাম বাড়ছে ২০ শতাংশ
সবজির বাজারের চাপের পাশাপাশি বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম। মাসখানেক ধরে আটা-ময়দা ও তেলের দাম বাড়তি। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, এক মাসে ময়দার দাম ১১ শতাংশ এবং চিনির দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দর বেড়েছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ।
এসব পণ্যের দাম বাড়ায় বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হস্তচালিত বেকারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি।
বেকারি মালিকরা জানান, আগামীকাল শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি দাম না বাড়িয়ে পণ্যের ওজন কমিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ ১০ টাকার রুটি বা বিস্কুটের দাম ১০ টাকাই থাকবে। তবে আগে যে পণ্যটির ওজন ছিল ৩০০ গ্রাম, সেটি হয়তো ২৫০ গ্রাম বা ২২০ গ্রাম করা হতে পারে।
সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, গত ছয় মাসে আড়াই হাজার টাকার ময়দার বস্তা বেড়ে তিন হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। ২৫-২৬ হাজার টাকার তেলের ড্রাম এখন ৩৫-৩৬ হাজার টাকা। চিনির বস্তার দামও পাঁচ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। এই তিন কাঁচামাল দিয়েই বেকারির বিস্কুট, পাউরুটিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়। বেকারি মালিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দাম সমন্বয় না করে উপায় নেই।
তিনি বলেন, কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ১০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে ছয় মাসের মধ্যে বেকারি খাত ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
বাজারে বাড়তি দামের চাপ, ভোক্তার প্রশ্ন একটাই
একদিকে কাছাকাছি বাজারে একই সবজির দামে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পার্থক্য, অন্যদিকে ডিম-মুরগি ও মাছের বাড়তি দাম। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বেকারি পণ্যের নতুন মূল্যবৃদ্ধি। সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি খরচের চাপ আরও বাড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
ব্যবসায়ীদের যুক্তিতে পরিবহন, দোকান ভাড়া, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচের বিষয়টি উঠে এলেও মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে একই পণ্যের দামে এত বড় পার্থক্য কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
