ডিম-মুরগি, ডাল, আটা-ময়দা ও চিনির দামও ঊর্ধ্বমুখী—নিম্ন আয়ের মানুষের সংসারে বাড়ছে চাপ। ফাইল ছবি
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি মিলছে না। একদিকে আগে থেকেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, ডাল, আটা-ময়দা ও চিনিসহ বেশ কিছু পণ্য; অন্যদিকে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে কাঁচামরিচে—এক দিনের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৬০ টাকা।
পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দুয়েক দিনের মধ্যে খুচরা বাজারে পড়ে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে সামনে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি মিলছে আলু ও পেঁয়াজে। বর্তমানে আলু কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পণ্যের অস্বাভাবিক দামে চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নতুন করে দাম বাড়ার এই প্রবণতা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী ধীরে ধীরে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
‘দুদিনেই দ্বিগুণ’ কাঁচামরিচের দাম
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজারে কথা হয় মোটর ওয়ার্কশপে কর্মরত মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এক পোয়া কাঁচামরিচ কিনেছেন ৪০ টাকায়, যেখানে মাত্র দুদিন আগে একই পরিমাণ মরিচ কিনেছিলেন ২০ টাকায়।
মিজানুরের প্রশ্ন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, কিন্তু নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের আয় তো একই থাকবে। তাঁর আশঙ্কা, এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা আরও দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দুই গুণ বাড়ছে। তাদের অনেকে দুই-তিন কেজি করে নিয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরাও সুযোগে ১০ টাকার জিনিসের ১৫ টাকা দাম নেবে। কিন্তু আমাদের কী হবে?’
বেতন বাড়ার আগেই বাজারের ধাক্কা
বেসরকারি চাকরিজীবী কামাল হোসেনের মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। গতকাল আগারগাঁওয়ের কাঁচাবাজারে তিনি জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার খবরে একদিকে পরিবারের কাছে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে।
সংসারের বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর বেগুনবাড়ীর গৃহিণী মারিয়া বেগম গতকাল কারওয়ান বাজার থেকে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল কিনেছেন ১৯০ টাকায়। বোতলজাত তেলের দাম বেশি হওয়ায় খোলা তেলই কিনতে হয় তাঁকে।
মারিয়া বেগমের ভাষায়, ‘যেভাবে তেল-আটার দাম বাড়ছে, সংসার চালাইতে দম বাইর হই যায়।
দুদিনে পটোল-ধুন্দল-ঝিঙার দাম বেড়েছে ১০ টাকা
গত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারে পটোল, ধুন্দল ও ঝিঙা বিক্রি হয়েছে কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। মাত্র দুদিন পর গতকাল এসব সবজির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এটি। ঢ্যাঁড়শের দামও কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা—এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
তবে সবচেয়ে বেশি চমক দিয়েছে কাঁচামরিচ। গত বুধবার ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে।
কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনে আগারগাঁওয়ে ভ্যানে বিক্রি করেন আবদুর রহিম। তাঁর দাবি, এক দিনের ব্যবধানে কারওয়ান বাজারে সবজির প্রতি পাল্লায় (৫ কেজি) ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
তেলের সরবরাহ বাড়লেও স্বস্তি নেই
বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ানোর পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম সরকারিভাবে বাড়ানো না হলেও বাজারে বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০ টাকা হলেও ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে প্রায় ১৯০ টাকা। একইভাবে খোলা পাম অয়েলের নির্ধারিত দাম ১৬৩ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৭৫ টাকায়।
প্যাকেটের চেয়েও দামি খোলা চিনি
চিনির বাজারেও দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক চিত্র। প্যাকেটজাত চিনি কেজি ১১০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খোলা চিনি কিনতে হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা দিয়ে।
কারওয়ান বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হান বলেন, প্যাকেটের গায়ে ১১০ টাকা লেখা থাকলেও কোম্পানি ১০৯ টাকায় সরবরাহ করছে। ফলে কেজিতে মাত্র এক টাকা লাভ থাকে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো প্যাকেট চিনি কমিয়ে দেওয়ায় খোলা চিনির চাহিদা বাড়ছে।
তাঁর দাবি, ডাল, আটা, চিনিসহ কয়েকটি পণ্যের পাইকারি দর ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব শিগগিরই খুচরা বাজারেও পড়তে পারে।
আটা-ময়দাতেও বাড়ছে অস্বস্তি
গত এক থেকে দেড় মাসে আটার দামও বেড়েছে। খোলা আটা কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ময়দার দামও বেড়েছে সর্বোচ্চ ১০ টাকা। খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ছোলা, ছোলার বুট ও মসুর ডালের দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা আটার দাম বেড়েছে ৩ শতাংশ, খোলা ময়দার ১৩ শতাংশ এবং চিনির দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
ডিম-মুরগির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
সবজির পাশাপাশি প্রায় দেড় মাস ধরে ডিম ও মুরগির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলে চাল-ডাল-তেল-সবজির পাশাপাশি আমিষের বাজারও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারির দাবি
নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমদানি ও বাজারমূল্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।
তিনি বলেন, কঠোর তদারকির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চলছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে এক অনুষ্ঠানে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, টিসিবির মাধ্যমে মাসে প্রায় ৭৮ লাখ পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়মিত ওএমএস কার্যক্রমও চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারে যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র খোলা, আমদানি ও সরবরাহের ওপর সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।
সামনে কী?
সবজির হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি, তেল-আটা-ময়দা-চিনির ঊর্ধ্বমুখী বাজার এবং ডিম-মুরগির বাড়তি দাম—সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ এখন বহুমুখী। সরকারি পর্যায়ে তদারকি ও ভর্তুকি কার্যক্রম চললেও বাজারে দাম বাড়ার গতি থামানো না গেলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন সীমিত আয়ের মানুষই।
কারণ আয় না বাড়লেও যদি প্রতিদিনের বাজার খরচ বাড়তে থাকে, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের হিসাবের খাতায় ‘সংসার চালানো’ই হয়ে উঠবে সবচেয়ে কঠিন হিসাব।
