লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে কমিশন, ৪০–৫০ লাখ টাকার কেনাকাটায় অনিয়ম, জ্বালানি বিল আটকে রাখা এবং ছুটি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। ফাইল ছবি
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে অর্থ আদায়, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, জ্বালানি ও বিভিন্ন বিল আটকে রাখা, অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ এবং বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর দাবি হলো, কথিত ঘুষের অর্থের হিসাব সরাসরি টাকার অঙ্কে না লিখে সাংকেতিক কোডের মাধ্যমে একটি ডায়েরিতে সংরক্ষণ করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিডির ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে থাকা ওই ডায়েরিতে অর্থ আদায়ের হিসাব রাখা হয়। প্রতিটি কোডের আর্থিক মূল্য ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে। দিন শেষে কোড অনুযায়ী হিসাব মিলিয়ে অর্থ সংগ্রহ এবং সংগৃহীত টাকার একটি অংশ ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের একজনের দাবি, লাইসেন্স, ফায়ার রিপোর্টসহ বিভিন্ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এবং কথিত ডায়েরির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
পদোন্নতি ও ঢাকা বিভাগে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ছালেহ উদ্দিনের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, তিনি সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক/সমমান পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতির আগে তাঁর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন ছিল এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া পদোন্নতির পর ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক পদে দায়িত্ব পেতে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নুর উদ্দিন আনিসের নাম উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লাইসেন্সে নির্ধারিত ‘রেট’, ফায়ার রিপোর্টে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ
ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স প্রদান ও ফায়ার রিপোর্ট প্রস্তুতকে ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগটি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর সংযোজনের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা হয়। এমনকি প্রয়োজনীয় রিপোর্টে স্বাক্ষর করতেও গড়িমসি করা হয় বলে দাবি করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের একজনের ভাষ্য, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে কথিত অর্থ আদায়ের পরিমাণ, কমিশনের হার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
কোডে অর্থের হিসাব, দিন শেষে ‘সেটেলমেন্ট’
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কথিত অর্থ লেনদেনের হিসাব সাংকেতিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের দাবি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি টাকার অঙ্ক না লিখে বিভিন্ন কোড ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি কোডের বিপরীতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকে বলে তাঁদের দাবি।
পিএ জাকিরের কাছে থাকা একটি ডায়েরিতে এসব হিসাব সংরক্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। দিন শেষে কোডের সংখ্যা ও নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী হিসাব মিলিয়ে অর্থ বুঝে নেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে গাড়িতে করে তেজগাঁওয়ে ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে কথিত ডায়েরিটি সরেজমিনে যাচাই, এর বিষয়বস্তু নিশ্চিত করা কিংবা অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসার তথ্য পাওয়া যায়নি।
৪০–৫০ লাখ টাকার কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ
ছালেহ উদ্দিনের দায়িত্বকালে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার কেনাকাটায় নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্টেশনারি ও গাড়ির পাম্পসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় যথাযথভাবে দেখানোর পরিবর্তে এসব অর্থের ব্যয় ‘আসবাবপত্র’ ক্রয়ের খাতে দেখানো হয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এমন অসংগতি হয়ে থাকলে তা আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত কেনাকাটার নথি, বিল-ভাউচার, দরপত্র এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র যাচাই ছাড়া অনিয়মের প্রকৃত ধরন বা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল নিয়ে সংকট
ঢাকা বিভাগের কয়েকটি ফায়ার স্টেশনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং খাবারের বিল নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় বা বিল পরিশোধে জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষ করে বারিধারা ফায়ার স্টেশনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সংকটের কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বকেয়া বা অন্যান্য সমস্যার কারণে ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
জরুরি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত স্টেশনগুলোর জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা সেবার প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি, বকেয়ার পরিমাণ এবং সরবরাহ বন্ধ হওয়ার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘মাসোহারা’ না দিলে ছুটি আটকে দেওয়ার অভিযোগ
অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ডিএডিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ না পেলে ছুটি আটকে দেওয়া কিংবা বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র স্টেশন অফিসারদের সাপ্তাহিক ছুটি নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ছুটি অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিয়মের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং আর্থিক লেনদেন প্রভাব ফেলছে।
তবে ছুটি আটকে দেওয়ার নির্দিষ্ট ঘটনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক নথি যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ
ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অতীতেও বদলি-বাণিজ্য ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠার কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সহকারী পরিচালক আনিসের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক লেনদেন পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য নথি, নির্দিষ্ট লেনদেনের তথ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
জবাব মেলেনি, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত
ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সেবার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে কথিত কমিশন, সাংকেতিক কোডে অর্থের হিসাব, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম এবং অধীনস্থ কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগগুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডিডি মো. ছালেহ উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ক্রয়সংক্রান্ত হিসাব, বিল-ভাউচার, লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টের প্রক্রিয়া এবং কথিত ডায়েরির বিষয়বস্তু যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগে নাম আসা সবার বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা গেলে পুরো বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
