নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির, স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা আনন্দিতা। নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। ফাইল ছবি
বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও, আমার আসতে একটু দেরি হবে। একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে কথাগুলো বলেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪৪)। কে জানত, এটিই হবে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথোপকথন! যে মানুষটি একটু পর বাড়ি ফেরার কথা বলে বের হয়েছিলেন, তিনি আর ফিরলেন না। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে থেমে গেল তাঁর জীবন। পিতৃহারা হলো চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্থি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান। স্বামীকে হারিয়ে দুই অবুঝ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে এখন দিশেহারা আনন্দিতা।
বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভার তেলনজিয়ায় একটি গ্রামের দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দেড় বছর বয়সী ছেলেকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে গিয়েছিলেন আলিফ। কিছুক্ষণ পরই দুর্বৃত্তদের গুলিতে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন, অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দুই শিশুর ভবিষ্যৎ।
গুলির শব্দ শুনে ভেবেছিলেন পটকা, পরে জানলেন স্বামী আর নেই
স্বামীকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আনন্দিতা সাংমা। কোলে ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে স্বামীর মরদেহের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।
কাঁদতে কাঁদতে আনন্দিতা বলেন, এভাবে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম, কেউ হয়তো পটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাকে মেরে ফেলেছে।
স্বামীকে আর ফিরে পাবেন না—এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে তাঁর চাওয়া, স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যেন কোনোভাবেই আইনের আওতার বাইরে থাকতে না পারেন।
আনন্দিতা বলেন, আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের কঠিন শাস্তি হোক, এটাই আমি চাই।
মুঠোফোন নিতে ফিরে এসে গুলির শিকার
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে তেলনজিয়ার একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন সাংবাদিক আলিফ। পরে তিনি বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু নিজের মুঠোফোনটি দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আবার সেখানে ফিরে আসেন।
ফোনটি নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় সেখানে হাজির হন দুই যুবক। তাঁরা দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এর পরপরই আলিফকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়েন তাঁরা। আকস্মিক গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে দুই যুবক পালিয়ে যান।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আলিফকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সামান্য একটি মুঠোফোন নিতে ফিরে আসাই কি তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তের কারণ হয়ে দাঁড়াল? কেন তাঁকে এভাবে গুলি করে হত্যা করা হলো—এ প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয় মানুষ। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অবশ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।
পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী চায়ের দোকানি রবিন রাংসা জানান, সাংবাদিক আলিফ চা পান করে চলে যাওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে গিয়েছিলেন। পরে ফোন নিতে ফিরে এসে সেটি নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক তাঁর কাছে সিগারেট চান। এরপরই আলিফকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।
রবিন রাংসা বলেন, আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় চলে যাই।
তাঁর ভাষ্য, দুই যুবকের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তাঁদের একজনের পরনে লুঙ্গি এবং অন্যজনের পরনে প্যান্ট ছিল। গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তাঁরা পালিয়ে যান।
অন্যদিকে, আলিফের শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তাঁরা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে আলিফকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল।
দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে আনন্দিতা
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি।
তাঁর গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে। তিনি মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। থাকতেন দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে।
প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন আলিফ। তাঁদের সংসারে চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্থি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।
যে বাবার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকার কথা ছিল দুই শিশুর, সেই বাবার আর কখনো ঘরে ফেরা হবে না। যে স্ত্রী স্বামীর জন্য রাতের খাবার ও ঘরে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁকে এখন সামলাতে হচ্ছে স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতা।
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামান আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।
আগের ওই হামলার সঙ্গে এবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে আগেও হামলার শিকার হওয়ার তথ্যটি নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে।
পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ধারণা পুলিশের
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য আলিফের মরদেহ নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কারা এবং কী কারণে সাংবাদিক আলিফকে হত্যা করেছে? আগের হামলার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তে উঠে আসা প্রয়োজন। পরিবারের দাবি, হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
আর তেলনজিয়ার সেই বাড়িতে এখনো রয়ে গেছে একজন মানুষের ফিরে আসার অপূর্ণ অপেক্ষা—যে মানুষটি স্ত্রীকে বলেছিলেন, আমার আসতে একটু দেরি হবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ আর কোনো দিন হবে না।
