ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য
দিনে ৩০০টির বেশি আবেদন, ৪–৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ—সরকারি কম্পিউটারে বহিরাগত, দালালদের অবাধ বিচরণ। ফাইল ছবি
সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও যেন শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি। পাসপোর্ট করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়া এবং কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বিরুদ্ধে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরও সরাসরি আবেদন করলে নানা ধরনের ভুল-ত্রুটি বের করা হয়। অথচ কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে একই ফাইল জমা পড়লে দ্রুত তা গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। কাজের ধরন ও জরুরিতার ওপর নির্ভর করে এ জন্য ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘চ্যানেল’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালদের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তীর বর্তমান উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের দিকে। পাসপোর্ট আবেদনকারীদের কাছে তিনি ‘দরবেশ বাবা’ নামেও পরিচিত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের বিদেশমুখী প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসে সেবাগ্রহীতার চাপও বেড়েছে। জুলাই মাসে জেলার প্রবাসীরা দেশে ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এমন বাস্তবতায় পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা নিতে এসে অতিরিক্ত অর্থ ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগকে গুরুতর বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘চ্যানেল’ ছাড়া কি পাসপোর্টের ফাইল চলে না?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি আবেদনকারীদের ফাইলে ছোটখাটো ভুল বা ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে ফাইল জমা পড়লেই যেন বদলে যায় নিয়মের চিত্র। একই ধরনের ত্রুটি তখন আর বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
এ ক্ষেত্রে ফাইলপ্রতি সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি ফাইলের ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ আরও বাড়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সর্বোচ্চ অর্থের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।
অফিসের ভেতরেও কথিত দালালদের অবাধ চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁদের নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের প্রশ্রয়েই এসব কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘চ্যানেল’ পরিচালনায় উপপরিচালকের সঙ্গে উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক এবং সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনেরও ভূমিকা রয়েছে।
সরকারি কম্পিউটারে বহিরাগত, প্রশ্ন নিরাপত্তায়
শুধু আবেদনকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নয়, সরকারি অফিসের অভ্যন্তরে বহিরাগত ব্যক্তির কাজ করার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
জহির নামে এক ব্যক্তিকে পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে সরকারি কম্পিউটারে বসে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাজ করতে দেখা যায়। দোতলার একটি কক্ষে কয়েকজন কথিত দালালকে তাঁর কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসতেও দেখা যায়।
পরিচয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি একটি আবেদনপত্র দিয়ে মুখ আড়াল করে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাঁকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষের দিকে যেতে দেখা যায়। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় গেটে থাকা আনসার সদস্যের কাছেও একটি আবেদনপত্র দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
পুলিশের সহায়তায় তাঁকে আটক করা হলে তিনি আবার জয়নাল আবেদীনের কাছে যান। এ সময় জয়নাল আবেদীন ক্যামেরার সামনে ওই ব্যক্তিকে চেনেন না বলে দাবি করেন।
পরে ওই ব্যক্তিকে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পরে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি একসময় আনসার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি পাসপোর্ট অফিসে এসে বিভিন্ন কাজ করেন। তবে কার অনুমতিতে তিনি সরকারি কম্পিউটার বা সার্ভারে কাজ করেন, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে কথিত ‘চ্যানেল’-এর যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
সরকারি অনুমোদিত জনবলের বাইরে কোনো ব্যক্তি সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভারে কাজ করতে পারেন কি না—এ প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর দেননি উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির। বরং ওই ব্যক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দিনে ৩০০টির বেশি আবেদন, লাখ লাখ টাকার ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৩০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আবেদনের একটি বড় অংশ কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
প্রতি আবেদনে গড়ে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হলে দৈনিক ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই অর্থ প্রতি বুধবার বিকেলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, আদায় করা অর্থের বড় অংশ উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে যায় এবং বাকি অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করা হয়।
কথিত ‘চ্যানেল’-এর একজন সদস্যও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাঁর দাবি, মোট আদায় করা অর্থের ৫০ শতাংশ উপপরিচালকের ড্রয়ারে রাখা হয় এবং বাকি অর্থ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে এইদাবির স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অফিসের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন
পাসপোর্ট অফিসের বিভিন্ন কক্ষে বহিরাগতদের অবাধে প্রবেশ ও বের হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা এসব ব্যক্তিকে দালালচক্রের সদস্য বলে দাবি করেছেন।
এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নৈশপ্রহরীদের তাঁদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাঁদের মতে, দায়িত্বের বাইরে এ ধরনের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকলে সরকারি নথি, আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আগেও তদন্ত-অভিযান
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দুদক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পাসপোর্ট অফিসের প্রায় প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিষয়ে পৃথক অভিযোগ রয়েছে। এর আগে একাধিকবার তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি কবি আব্দুল মান্নানও পাসপোর্ট অফিসের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এত অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রশাসনের বক্তব্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, পাসপোর্ট অফিস তাঁর সরাসরি আওতাধীন নয়। তবে জেলার নাগরিকরা সেখানে কোনো ধরনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবে। তিনি জনগণকে জেলা প্রশাসনের অভিযোগ সেলে সমস্যার কথা জানানোর আহ্বান জানান।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো অভিযোগেরই সন্তোষজনক ব্যাখ্য দিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্যের আসল রহস্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিস ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কথিত ‘চ্যানেল’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা নিয়ন্ত্রণ, দালালদের অবাধ চলাচল, সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভারে বহিরাগতদের কাজ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির বিষয় নয়; সরকারি সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভারে বহিরাগতদের প্রবেশের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সবগুলো এখনো কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
