রবিবার, ৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক-এনবিআরের দ্বারে বিস্ফোরক অভিযোগ, ঢাকা কাস্টম হাউসে রাকিব-ফরিদের বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ৩০, ২০২৬ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস, ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ; নেপথ্যে প্রভাবশালী কাস্টমস সিন্ডিকেট?। ফাইল ফটো

রাজধানীর ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মো. আব্দুর রাকিব এবং রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) ফরিদুজ্জামান।

গত ১১ জুন ২০২৬ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ১২ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগটি করেন এইচ. এম. ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাসের একটি কথিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড (Alien Apparels Ltd), ইউরেনাস অ্যাপারেলস (প্রাইভেট) লিমিটেড (Uranus Apparels (Pvt.) Ltd) এবং কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড (QUICK APPARELS LIMITED)।

অভিযোগকারী হুমায়ুন কবিরের দাবি, তার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী এই কথিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপরই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, কুরিয়ারের ‘খাঁচা’র মাধ্যমে আসা এসব পণ্যের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর এআরও রাকিব ও আরও ফরিদ ওই কর্মচারীকে ডেকে পাঠান। বিষয়টি যাতে প্রকাশ্যে না আসে, সে জন্য তার কাছে ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্ষমতার বলয়ে দুই কর্মকর্তা?

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এআরও মো. আব্দুর রাকিব কাস্টমস কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা পিছিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামান প্রিভেন্টিভ শাখার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) আমিনুলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনিও প্রভাবশালী বলয়ের সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীর দাবি, বন্ধ বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ৩৩ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির কথিত ঘটনায় কুরিয়ার ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা থাকলেও দায়ভার একতরফাভাবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে।

বিল অব এন্ট্রিতে মিলছে বিপুল পণ্য খালাসের তথ্য

সংগৃহীত নথিপত্র ও বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণের বরাতে অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বিপুল পরিমাণ লেস (Lace), ওভেন ফেব্রিক (Woven Fabric), নিট ফেব্রিক, বাটন, জিপার ও রাবার প্যাচ আমদানি করা হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু ইউরেনাস অ্যাপারেলসের নামেই ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ এবং এর আগের বিভিন্ন তারিখে একাধিক বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ফেব্রিক স্যাম্পল ও ওভেন ফেব্রিক খালাসের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে কুইক অ্যাপারেলস ও এলিয়েন অ্যাপারেলসের নাম ব্যবহার করেও বিপুল অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাসের অভিযোগ উঠেছে।

নথির তথ্যানুযায়ী, এসব আমদানির মোট অ্যাসেসড ভ্যালু বা মূল্যায়ন দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৭ টাকা। এর বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৪৮৬ টাকা। যদিও অভিযোগকারীর দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৩৩ কোটি টাকার বেশি।

বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে এসব পণ্য আমদানি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদক-এনবিআরের নজরদারি কতটা কঠোর হবে?

অভিযোগকারী ব্যবসায়ীর ভাষ্য, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কথিত সিন্ডিকেটের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকরাও চাপ ও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন বলে দাবি তার।

গুরুতর এসব অভিযোগের অনুলিপি কাস্টম হাউস ঢাকার কমিশনার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা শাখা সিআইআইসি-র মহাপরিচালকের কাছেও দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগে উল্লিখিত নথি, বিল অব এন্ট্রি ও রাজস্ব ফাঁকির তথ্য যাচাই করে দুদক ও এনবিআর কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়? সত্যিই কি এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, নাকি অভিযোগের আড়ালে অন্য কোনো বিরোধ? তদন্তেই মিলতে পারে তার উত্তর।

অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন অভিযুক্তরা

৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিবের সঙ্গে ‘আমাদের মাতৃভূমি’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেন, “এটা একটা ভুয়া অভিযোগ। আপনি আমার অফিসে আসেন। কফির দাওয়াত রইলো।

অন্য অভিযুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামানের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘আমাদের মাতৃভূমি’র প্রতিনিধির কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে অভিযোগকারীকে তিনি চেনেন না বলে দাবি করেন।

তবে ফরিদুজ্জামানের পাঠানো ওই চিঠিতে থাকা অভিযোগকারীর স্বাক্ষর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুদকে দেওয়া অভিযোগপত্রে থাকা একই ব্যক্তির স্বাক্ষরের মধ্যে মিল নেই বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে ফরিদুজ্জামানও ‘আমাদের মাতৃভূমি’র প্রতিনিধিকে কৌশলে তার অফিসে গিয়ে দেখা করার অনুরোধ করেন।

সব মিলিয়ে, ৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি, বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির মতো গুরুতর অভিযোগের পর এখন নজর দুদক ও এনবিআরের তদন্তের দিকে। অভিযোগগুলো তদন্তে কতটা সত্য প্রমাণিত হয় এবং এর নেপথ্যে কারা রয়েছেন—তা বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট মহল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।