বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ময়মনসিংহ এলজিইডিতে ‘৩%’ কমিশনের অভিযোগ, কর্মকর্তা বদলালেও কাটেনি প্রশ্ন

মামুনুর রশীদ মামুন
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ১:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ময়মনসিংহ কার্যালয়ে ঠিকাদারদের বিল ছাড়সহ বিভিন্ন দাপ্তরিক ধাপে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলেছে, দায়িত্বের চেয়ার বদলেছে—কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিলের ফাইল নিষ্পত্তিতে কথিত ‘৩% কমিশন’ বা পার্সেন্টেজ প্রথার অভিযোগ যেন কাটছেই না। বরং নতুন করে উঠছে একই ধরনের অর্থ দাবির অভিযোগ।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, কাজের চূড়ান্ত ও আংশিক বিল নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত সরকারি নিয়মের বাইরে কথিত কমিশন না দিলে ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখার ঘটনা ঘটছে। ফলে একদিকে বিল পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অন্যদিকে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে ঠিকাদারদের।

এর আগে গত ৩০ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে এবং ৩১ জুলাই অন্যান্য গণমাধ্যমে ময়মনসিংহ এলজিইডির অনিয়ম ও কথিত কমিশন বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলেও অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের।

বিলের ফাইলে ‘৩%’ কমিশনের চাপের অভিযোগ

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজের চূড়ান্ত ও আংশিক বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে উৎকোচ বা কমিশন না দিলে ফাইল নিষ্পত্তিতে গড়িমসি করা হয়। কমিশন দিতে অনীহা প্রকাশ করলে বিল ছাড়ে অযথা বিলম্বের পাশাপাশি নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইতিপূর্বে কর্মরত হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিল ছাড়ের বিপরীতে ‘৩%’সহ বিভিন্ন নামে কথিত ‘দাপ্তরিক খরচ’ আদায়ের অভিযোগ ছিল। বর্তমানে হিসাবরক্ষণ শাখায় দায়িত্ব পালনকারী আবুল হাসিমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অনৈতিক সুবিধা ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিল ছাড়ের বাইরেও নানা অভিযোগ

ঠিকাদারদের অভিযোগ, অনিয়মের প্রশ্ন শুধু বিল নিষ্পত্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন, কাজের মূল্যায়ন, নোটিফিকেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স (NOA) প্রদান, চুক্তিপত্র সম্পাদন এবং সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে অর্থ দাবি করা হয়।

কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই প্রতিবেদন তৈরির অভিযোগও রয়েছে। আবার কথিত অনৈতিক সুবিধা না দিলে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন প্রতিবেদন, নোটশিট, বিল-ভাউচার, ফাইল চলাচলের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

কর্মকর্তা বদলি-অবসরের পরও কেন একই অভিযোগ?

ময়মনসিংহ এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল ইতোমধ্যে বদলি হয়েছেন। তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম গত ২৯ জুন অবসরে গেছেন। দায়িত্বে থাকাকালে এবিএম নাজমুল করিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তার জানা নেই।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, কর্মকর্তা বদলি কিংবা অবসরে গেলেই কি অভিযোগের অবসান ঘটে? তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ফাইল, নোটশিট, বিল-ভাউচার ও অন্যান্য দাপ্তরিক নথি সংরক্ষিত থাকার কথা। সেসব নথি পর্যালোচনা করলেই অভিযোগের সত্যতা কিংবা অভিযোগের পেছনে কোনো ধারাবাহিকতা রয়েছে কি না, তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

নতুন নেতৃত্বের সামনে পুরোনো অভিযোগের ছায়া

গত ১৬ জুলাই ময়মনসিংহ এলজিইডির নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছেন হুমায়ুন কবির। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কারণে পূর্ববর্তী সময়ের সব অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত অবগত নন বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (SE) নাঈমা নাজনীন নাজ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পরও যদি একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে না দেখে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি খতিয়ে দেখার দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলি নয়, প্রয়োজন নথিভিত্তিক তদন্ত

সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান ঠিকাদার ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, শুধু কর্মকর্তা বদলি কিংবা দায়িত্ব পরিবর্তন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

তাদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়ের বিল নিষ্পত্তির ফাইল, নোটশিট, বিল-ভাউচার, সাইট পরিদর্শন প্রতিবেদন, NOA, চুক্তিপত্র, সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা হোক।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না মিললে দায়ী ব্যক্তিদের দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিল নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

ঠিকাদারদের প্রশ্ন—কর্মকর্তা বদলালেই যদি একই ধরনের ‘৩%’ কমিশনের অভিযোগ ফিরে আসে, তাহলে সমস্যাটি কি ব্যক্তি পর্যায়ে, নাকি পুরো প্রক্রিয়ার কোথাও? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ