শাস্তি পেয়েও যেন থামছে না অভিযোগ। বহাল তবিয়তে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও প্রশাসনিক অনিয়ম—একের পর এক অভিযোগ উঠছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাদারীপুর সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক সামসুদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে। এমনকি অতীতে তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর বিভাগীয় শাস্তিও হয়েছে তাঁর। এরপরও নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন উঠেছে—শাস্তির পরও কীভাবে একই ধরনের অভিযোগে তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন?
অভিযোগকারীদের দাবি, মাদারীপুর বিআরটিএ সার্কেলে মোটরযানের ফিটনেস সনদসহ বিভিন্ন সেবায় গ্রাহক হয়রানি ও নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।
মন্ত্রীর কাছে একগুচ্ছ অভিযোগ
চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল মাদারীপুর সদর উপজেলার আলীর বাজার গ্রামের মাস্টারবাড়ির মো. নুরুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগপত্রে সামসুদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ গ্রহণ, দুর্নীতি, নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় এবং মোটরযানের ফিটনেস সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রাহক হয়রানির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিজের নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ, জমি-বাড়ি, ফ্ল্যাট এবং বিলাসবহুল যানবাহন ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে অভিযোগকারী এসব সম্পদের সুনির্দিষ্ট দলিল বা তথ্যপ্রমাণ সংযুক্ত করেননি।
অভিযোগ তদন্তে বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি
অভিযোগটি অনুসন্ধান ও তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের কাছে গত ২৩ জুলাই একটি চিঠি পাঠিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখা।
সিনিয়র সহকারী সচিব এস.এম. শান্তুনু চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠির স্মারক নম্বর ৩৫.০০.০০০০.০০০.০২৮.২৭.০০১৭.২৩.১৫৭।
২০২৩ সালেও উঠেছিল গুরুতর অভিযোগ
বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, সামসুদ্দীন আহম্মেদ এর আগে বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেলে কর্মরত ছিলেন। ওই সময়ে ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর একটি বহুল প্রচলিত দৈনিক পত্রিকায় ‘৬ ঘণ্টায় ১২শ ফিটনেস সনদ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অভিযোগগুলো তদন্তে বিআরটিএ দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। একই ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তৎকালীন উপসচিব মো. মনিরুল আলমও একটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উভয় তদন্ত প্রতিবেদনেই সামসুদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে কর্তব্য পালনে অবহেলা এবং কর্তৃপক্ষের আইনসংগত আদেশ অমান্যের বিষয় উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর তাঁকে মাদারীপুর সার্কেলে বদলি করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নং ২৫/২০২৩ রুজু করে বিআরটিএ।
দ্বিতীয় তদন্তেও মিলেছিল অনিয়মের প্রমাণ
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দীন আহমেদ তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে সামসুদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে মোটরযান যথাযথভাবে পরিদর্শন না করেই ফিটনেস সনদ প্রদান, মোটরযানের সঙ্গে পরিদর্শকের ছবি না তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মোটরযান বাস্তবে উপস্থিত ছিল কি না—সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণক উপস্থাপন করতে না পারার বিষয় উঠে আসে।
তদন্তে এসব বিষয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত
তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান প্রজ্ঞাপন জারি করে সামসুদ্দীন আহম্মেদকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩২(ক)(আ) ধারা এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করেন।
শাস্তি হিসেবে বিধি ৪(২)(খ) মোতাবেক দুই বছরের জন্য তাঁর বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট দণ্ডাদেশ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।
অর্থাৎ, আগের অভিযোগের তদন্ত, বিভাগীয় মামলা ও শাস্তির পরও এবার নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় পুরো বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
শাস্তির পরও কেন একই অভিযোগ?
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পূর্বের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং শাস্তিও হয়েছে—এরপরও একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফের ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ কেন উঠছে?
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনের ধরন, ফিটনেস সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী এবং আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানববন্ধন
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল মাদারীপুর সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছিল জেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সব মিলিয়ে মাদারীপুর বিআরটিএ সার্কেলের কার্যক্রম, সেবাপ্রদান পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখন নতুন অভিযোগের তদন্তে আগের বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তির বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না, সামসুদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে ওঠা বর্তমান অভিযোগের সত্যতা কতটা—এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
