আফতাবনগরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গ্রামে বহুতল মার্কেট— বাকেরগঞ্জের দর্জির দুই ছেলের ‘কালো টাকার সাম্রাজ্য’ ঘিরে তোলপাড়। ফাইল ছবি সংগৃহীত
সরকারি চাকরির পরিচয় মাত্র ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’। তৃতীয় শ্রেণির এই পদে মাসিক বেতন যেখানে সংসার চালাতেই হিমশিম খাওয়ার কথা, সেখানে সেই চাকরির আড়ালেই গড়ে উঠেছে শত কোটি টাকার অবিশ্বাস্য সাম্রাজ্য! রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত জনপদ— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তাদের বিত্ত-বৈভবের ছাপ। দুর্নীতি, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বরিশালের বাকেরগঞ্জের এক দর্জির দুই ছেলে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। বাকেরগঞ্জের চর লক্ষিপাশা গ্রামের সাধারণ দর্জি মোহাম্মদ আলী সিকদারের দুই ছেলে— মেহেদী হাসান প্রিন্স সিকদার ও মোঃ মামুন সিকদার— প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রকল্পে অফিস সহকারী পদে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই যেন বদলে যায় ভাগ্যের চাকা।
অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি রপ্তানির সিন্ডিকেট, অবৈধ ছাড়পত্র বাণিজ্য, কমিশন ও ঘুষের মোটা অঙ্কের টাকার ওপর ভর করেই রাতারাতি হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী কোটিপতি।
সরকারি চাকরির আড়ালে রাজধানীর পল্লবীতে তারা গড়ে তুলেছেন ‘এম.এইচ. ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বিশাল ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চলছে বহুমুখী ব্যবসা, যার বড় অংশই কালো টাকা সাদা করার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। পারিবারিক মার্কেটে রয়েছে ‘বাটা’ ও ‘ওয়ালটন’-এর এক্সক্লুসিভ ফ্র্যাঞ্চাইজি। এছাড়া মেরিন ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, হার্ডওয়্যার সামগ্রীর আমদানি ও সরবরাহ ব্যবসাতেও রয়েছে তাদের শক্ত অবস্থান।
শুধু তাই নয়, রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ইউসিবি ব্যাংকের ‘উপায়’, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ‘মাইক্যাশ’ এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ‘টেলিক্যাশ’-এর ডিস্ট্রিবিউশন হাউসসহ একাধিক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চলছে হুন্ডি ও মানি লন্ডারিংয়ের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক।
উল্লেখযোগ্য সম্পদের ভেতর, সিকদার শপিং প্লাজা’ ‘সিকদার প্লাজা’ ‘এম.এইচ. এগ্রো কর্পোরেশন’ ও ‘নিলয় শপিং জোন’ নামে গড়ে উঠেছে একের পর এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর আফতাবনগরে রয়েছে নামে-বেনামে একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট ও দামী প্লট। আর নিজ এলাকা বাকেরগঞ্জে কিনেছেন বিঘার পর বিঘা জমি। সেখানে নির্মাণাধীন রয়েছে ১০ তলা ভবনের অনুমোদন পাওয়া বিশাল বাণিজ্যিক মার্কেট ও ‘সিকদার কমিউনিটি সেন্টার’।
সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তাদের বিলাসী জীবনযাপন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। যাদের সাধারণ যানবাহনে চলাচলের কথা, তারা ঘুরে বেড়ান বিলাসবহুল ‘টয়োটা প্রিমিও’ গাড়িতে। শখের গ্যারেজে রয়েছে লাখ লাখ টাকা দামের স্পোর্টস বাইক ‘ইয়ামাহা আর ওয়ান ফাইভ’।
সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে থেকে অনুমতি ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর প্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন এই দুই ভাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সরকারি পিয়ন থেকে শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এই দুই ভাই এখন এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই নেমে আসে ভয়ভীতি ও ক্যাডার বাহিনীর চাপ।
অভিযোগের বিষয়ে মেহেদী হাসান প্রিন্স সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এসব প্রতিষ্ঠান আমার বাবার। আমি শুধু এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। তবে সম্পদের উৎস ও ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
এদিকে, তাদের সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম ও বিদেশে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে
থাকছে—বিদেশে অর্থ পাচার, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আড়ালে হুন্ডি সিন্ডিকেট এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ার বিস্ফোরক তথ্য…
