রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘বিশ্ব মা দিবস আজ, মায়ের আঁচলেই মানুষের প্রথম পৃথিবী, প্রথম ভালোবাসা

রওশন জাহান মিতু
মে ১০, ২০২৬ ১:১২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

‘মা’—মাত্র একটি শব্দ। অথচ এই ছোট্ট শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে জন্মের আলো, নিরাপত্তার আশ্রয়, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নির্ঘুম রাত আর আজীবনের আত্মত্যাগের এক অনন্ত গল্প। পৃথিবীতে একজন মানুষের প্রথম স্পর্শ, প্রথম ভাষা, প্রথম নিরাপদ আশ্রয়—সবকিছুর শুরু হয় মাকে ঘিরেই। তাই যুগে যুগে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, ভাষা থেকে ভাষায় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নানা রীতি গড়ে উঠেছে। সেই আবেগেরই বৈশ্বিক প্রকাশ—বিশ্ব মা দিবস।

প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। দিনটি ঘিরে পরিবারে পরিবারে তৈরি হয় ভালোবাসার আবহ। কেউ মায়ের হাতে ফুল তুলে দেন, কেউ একটি ফোনকলেই জানিয়ে দেন মনের গভীর কৃতজ্ঞতা। তবে মা দিবসের গল্প কেবল আবেগের নয়; এর ভেতরে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংগ্রাম, প্রতিবাদ আর একজন নারীর অসম সাহসিকতার কাহিনি।

মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার সম্মানে উৎসব আয়োজন করা হতো। রোমান সভ্যতায় দেবী সাইবেলিকে ঘিরেও ছিল মাতৃত্ব উদযাপনের ঐতিহ্য। পরে ইংল্যান্ডে চালু হয় ‘মাদারিং সানডে’ যেদিন সন্তানেরা ফিরে আসত মায়ের কাছে। তবে আধুনিক মা দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

উনিশ শতকের অস্থির আমেরিকায় সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হো এবং অ্যান রিভস জার্ভিস নারীদের স্বাস্থ্য, শিশু পরিচর্যা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। ১৮৭০ সালে শান্তি ও মানবতার পক্ষে ‘মাদারস ডে প্রোক্লেমেশন’ প্রকাশ করেন জুলিয়া ওয়ার্ড হো। আর অ্যান রিভস জার্ভিস বিশ্বাস করতেন, পরিবার ও সমাজের জন্য মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিন থাকা উচিত।

কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ১৯০৫ সালের ৫ মে মারা যান অ্যান রিভস জার্ভিস। মায়ের মৃত্যু যেন বদলে দেয় তাঁর মেয়ে আনা জার্ভিসকে। মায়ের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—মায়ের স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করেই ছাড়বেন। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম। রাজনীতিবিদ, গভর্নর, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের কাছে একের পর এক চিঠি লিখে তিনি দাবি জানান—মায়েদের সম্মানে একটি জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে হবে।

অবশেষে ১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের সেন্ট অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় মা দিবস। সেদিন অংশগ্রহণকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ‘সাদা কার্নেশন’—আনা জার্ভিসের মায়ের প্রিয় ফুল। ধীরে ধীরে দিনটি ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Woodrow Wilson মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।

তবে যে নারী মা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই এই দিবসের বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামেন। আনা জার্ভিস চেয়েছিলেন, সন্তানরা মায়ের জন্য নিজের হাতে চিঠি লিখুক, সময় দিক, ভালোবাসা প্রকাশ করুক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের দোকান, শুভেচ্ছা কার্ড কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান মা দিবসকে ব্যবসায়িক উৎসবে পরিণত করে।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেছিলেন, আমি এই দিনটি ভালোবাসার জন্য চেয়েছিলাম; ব্যবসার জন্য নয়।
জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি এই বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়েছেন। নিজের সঞ্চয় পর্যন্ত ব্যয় করেছেন। শেষমেশ প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন আনা জার্ভিস।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে মায়ের ভূমিকার পরিধিও। একসময় মনে করা হতো, মায়ের দায়িত্ব কেবল সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ আজকের মা একই সঙ্গে সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরিবারের মানসিক শক্তি, কর্মজীবী নারী, উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সমাজ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন মা ভোরে উঠে সংসারের কাজ সামলান, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, আবার অফিস কিংবা ব্যবসার দায়িত্বও পালন করেন। গ্রামের মা কৃষিকাজে অংশ নেন, শহরের মা হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস বা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। অনেক পরিবারে মায়ের কাঁধেই টিকে থাকে পুরো সংসারের অর্থনৈতিক ভার।

তবুও বাস্তবতা হলো—সংসারের অদৃশ্য শ্রমের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো মায়ের কাঁধেই। কর্মজীবনের চাপ, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক অনিরাপত্তা, ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন নীরব যুদ্ধ লড়ে যান অসংখ্য মা। কেউ দূরে থাকা সন্তানের ভিডিও কলে বেঁচে থাকেন, কেউ বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ ঘরে অপেক্ষা করেন একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য। আবার অনেক একক মা সমাজের অসংখ্য বাধা পেরিয়ে সন্তানকে মানুষ করে তুলছেন দৃঢ় সাহসে।

তবুও মা থেমে থাকেন না। কারণ একজন মা কখনও নিজের ক্লান্তির গল্প বলেন না; তিনি শুধু সন্তানের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন।

উদযাপন যে দিনেই হোক, ফুল কিংবা উপহার যা-ই থাকুক—মা দিবসের সবচেয়ে বড় সত্য একটাই: পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, অনেক সংজ্ঞা হারিয়ে যায়। কিন্তু একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য কখনও বদলে যান না।

কারণ মা শুধু একজন মানুষ নন—তিনি একজন মানুষের প্রথম পৃথিবী, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম আশ্রয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।