ফেসবুক লাইভে উসকানির অভিযোগ প্রধান আসামির বিরুদ্ধে, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত। ছবি: সংগৃহীত
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) নামের এক যুবককে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে নিহতের বড় ভাই মো. আবদুল জলিল সানা বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি করা হয়েছে ফজলুল হক আমিনীকে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন দেবহাটার নাজিরের ঘের এলাকার মাহাতাব উদ্দীন খাঁর ছেলে মোক্তার হোসেন (৫৩) এবং রহিম বক্স মোল্যার ছেলে আসাদুল মোল্যা (৪৬)। নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে।
পারিবারিক বিরোধের অডিও ছড়িয়ে উত্তেজনা
নিহতের ছোট ভাই তৌসিফ রহমান সাগর জানান, শামীম মাদরাসা থেকে কামিল পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তাঁর আট বছর ও সাত মাস বয়সী দুটি সন্তান রয়েছে। পারিবারিক নানা অশান্তির কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সাগরের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের কথা-কাটাকাটি হয়। ওই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে একপর্যায়ে শামীম বিষপান করেন।
গত মঙ্গলবার দুপুরে তাঁকে দেবহাটার কুলিয়া এলাকার পল্লিচিকিৎসক সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এ সময় দেবহাটার কথিত তৌহিদী জনতার নেতা ফজলুল হক আমিনী ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফেসবুকে লাইভ করেন এবং লোকজনকে জড়ো হতে উসকানি দেন বলে অভিযোগ করেছেন সাগর।
চিকিৎসাকেন্দ্রে দুই দফায় হামলার অভিযোগ
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ফেসবুক লাইভের পর একদল লোক ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে ঢুকে শামীমের ওপর প্রথম দফায় হামলা চালায়। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সাগরের অভিযোগ, একই দিন রাত ৯টার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতেই সেখানে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়।
পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শামীমকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সাগর বলেন, তাঁর ভাই কোনো অপরাধ করে থাকলে প্রচলিত আইনে তাঁর বিচার হতে পারত। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
প্রধান আসামির ভূমিকা তদন্তে গুরুত্ব
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, নিহতের বড় ভাই আবদুল জলিল সানা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার ভোররাতে সুবর্ণাবাদ এলাকা থেকে মোক্তার হোসেন খান এবং নাজিরের ঘের এলাকা থেকে আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
ওসি আরও বলেন, ফেসবুকে লাইভ করে শামীমকে হত্যার উদ্দেশ্যে লোকজন জড়ো করার অভিযোগে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য, ডিজিটাল প্রমাণ ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজ ও প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলেও জানান ওসি।
ঘটনাটির প্রকৃত কারণ, হামলায় প্রত্যেকের ভূমিকা এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
