শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহারের পরই ফের বিতর্কে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ৬, ২০২৬ ৩:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

৪২ লাখ টাকা লুটপাট ও সাদা মহিষ বিতর্কে অভিযুক্ত সাবেক চিড়িয়াখানা কিউরেটর ডা. মিঠু; ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণ নিয়েও নানা অভিযোগ। ফাইল ছবি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের পরই তার বিরুদ্ধে আবারও নানা অভিযোগ উঠেছে। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, চাকরিতে পুনর্বহালের পর তার আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণের কারণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

৪২ লাখ টাকা ও সাদা মহিষ ঘিরে পুরোনো বিতর্ক

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ঈদুল আজহার আগে জাতীয় চিড়িয়াখানায় দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ৪২ লাখ টাকা আত্মসাৎ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং বিশেষ একটি সাদা রঙের মহিষের নামকরণ ও পরিচর্যা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ওঠে ডা. মিঠুর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দীর্ঘ তদন্ত ও বরখাস্তকাল অতিক্রমের পর সম্প্রতি তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এরপরই তার বিরুদ্ধে নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, পুনর্বহালের পর তার আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি; বরং কর্মস্থলে অস্বস্তি আরও বেড়েছে।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা অভিযোগ

ডা. মিঠুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, তিনি এ পর্যন্ত তিনটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত। প্রথম সংসারে সম্পর্কের অবনতি ও পরবর্তী সময়ে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে থাকা সন্তানদের খোঁজখবর ও ভরণপোষণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়েও বিচ্ছেদে গড়ায় বলে জানা গেছে। বর্তমানে তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করছেন তিনি। তবে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) ডরমেটরিতে নারীদের নিয়ে রাতযাপন এবং মাদক সেবনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ডা. মিঠু অবশ্য এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

ডা. মিঠুর রাজনৈতিক অতীত নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত ১৭ বছরে জাতীয়তাবাদী পেশাজীবীদের বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডে তার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। অথচ বর্তমানে নিজেকে বগুড়ার সন্তান ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার দাবি করেন ডা. মিঠু। তবে তার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলার বিষয়টি সামনে এনে কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, ওই মামলার পেছনে দাপ্তরিক দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন সময়ে একটি ভেড়া বিতরণ কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত না থেকে বাসায় অবস্থান করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। ফলে অতীতের বিভাগীয় মামলাকে কেবল রাজনৈতিক নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অধিদপ্তরে অসন্তোষ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের একাধিক কর্মকর্তা ডা. মিঠুকে ঘিরে চলমান বিতর্কে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে পেশাগত শিষ্টাচার, দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছ আচরণ প্রত্যাশিত। অথচ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অধিদপ্তরের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ প্রশাসনিক ও পেশাগত মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন বা স্বাস্থ্য নিয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

অভিযোগ অস্বীকার ডা. মিঠুর, প্রতিবেদকের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডা. আতিকুর রহমান মিঠুর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

চিড়িয়াখানার প্রায় ৪২ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও সাদা মহিষ বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, মহিষটি আমি নিজে নারায়ণগঞ্জ থেকে এনেছি। তার দেখাশোনা, ঘর বানানো—সব আমি করেছি। তাহলে অবহেলা করলাম কোথায়? রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে আমাকে এভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

নিজের সংসার ভাঙার পেছনে রাজনৈতিক নির্যাতনের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে একই কর্মস্থলে পোস্টিং থাকা সত্ত্বেও প্রথম সংসারে সম্পর্কের অবনতি কেন হয়েছিল—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন বলে প্রতিবেদকের ভাষ্য।

প্রথম স্ত্রীর সন্তানদের ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, প্রতিমাসে তাদের খরচের টাকা পাঠাই এবং দেখাও করি।

কেআইবি ডরমেটরিতে নারী নিয়ে রাতযাপন ও মাদক সেবনের অভিযোগের জবাবে ডা. মিঠু বলেন, “আমি জীবনে মদ খাইনি, মদ কী জিনিস তা ছুঁয়েও দেখিনি। সিগারেটও খাই না। আপনারা কেআইবিতে এসে কৃষিবিদদের জিজ্ঞেস করবেন ডা. মিঠু কেমন মানুষ। সততা আমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি আগাগোড়াই জাতীয়তাবাদী লোক। বিগত আওয়ামী লীগের সময় আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে, পাহাড়-পর্বত এলাকায় পোস্টিং দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমি যদি ক্ষমতার দাপট দেখাতাম, তবে আমার পোস্টিং বরিশালে হতো না।

প্রশাসনের করণীয় কী?

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠার পর সাময়িক বরখাস্ত এবং পরবর্তী সময়ে পুনর্বহালের বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে জাতীয় চিড়িয়াখানার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার নথি এবং পুনর্বহালের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ