‘মাইর মাইয়াডারে আইনা দাও, বাইচ্চা থাক বা মইরা যাক’—সুইটির পরিণতি জানতে আকুতি পরিবারের। সুইটি আক্তারের বাবা-মা। ছবি সংগৃহীত
আমার সুইটিরে আইনা দাও তোমরা। বাইচ্চা থাক বা মইরা যাক, আমার মেয়েরে আমার কাছে আন।’ সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এমন আকুতিতেই মেয়েকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জহুরা বেগমের। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে থাকা এক নারী তাঁর মেয়ে সুইটি আক্তার (২৫) বলে সন্দেহ করছে পরিবার। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি তারা।
মেয়ে কি বেঁচে আছেন, নাকি তাঁর ভাগ্যে ঘটেছে ভয়াবহ কোনো পরিণতি—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন সুইটির মা-বাবা। তিন বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি। গত ১৩ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। তখন মাকে জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর দেশে ফিরবেন। কিন্তু এরই মধ্যে সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়ায় মেয়ের জীবন নিয়ে গভীর শঙ্কায় পড়েছে পরিবারটি।
মঙ্গলবার সুইটিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা জহুরা বেগম। অন্যদিকে নির্বাক বাবা ফজল মিয়া তাকিয়ে আছেন মেয়ের ফিরে আসার পথের দিকে। ঘরের ভেতর-বাইরে স্বজনদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের সত্যতা জানতে একদিকে যেমন অপেক্ষা, অন্যদিকে মেয়ের কোনো খোঁজ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাঁদের প্রতিটি মুহূর্তকে ভারী করে তুলেছে।
সুইটি মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর আবার যোগাযোগ হলেও তাঁর আটকের বিষয়টি ছাড়া বিস্তারিত কিছু জানতে পারেননি তাঁরা। এখন শিরচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সুইটির প্রকৃত অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাইছে পরিবার।
কারাগারে থাকার কথা জানিয়েছিলেন সুইটি
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, কারাগারে থাকার সময় কখনো এক সপ্তাহ পর, কখনো এক মাস পর মেয়ের সঙ্গে কথা হতো। এভাবে প্রায় এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ করেন। তখনো তিনি কারাগারে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। এভাবে আরও প্রায় চার মাস যোগাযোগ ছিল। এরপর আবারও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফজল মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে ওই কথোপকথনে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানাননি তাঁর মেয়ে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের সঙ্গে সুইটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না পরিবার।
দুইবার বিয়ে, ভাঙে সংসার
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় উপজেলার তরফপুর গ্রামে সুইটির প্রথম বিয়ে হয়। এক বছরের মাথায় সেই সংসার ভেঙে যায়। এর এক বছর পর হিলড়া গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে হয় তাঁর। দ্বিতীয় স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য ধারদেনা করে অর্থ জোগাড় করেছিল পরিবার। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার ছয় মাস পর থেকে সুইটির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তাঁর স্বামী। পরে তাঁদেরও বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর জীবিকার সন্ধানে ২০২৩ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি। স্বজনদের দাবি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। এ জন্য নতু মিয়া নামে এক দালালকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়। সৌদি আরবের মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারে এক বছর পর
স্বজনদের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর গ্রেপ্তার হন সুইটি। তবে পরিবারের সদস্যরা এ খবর জানতে পারেন প্রায় এক বছর পর। ফোনে সুইটি নিজেই আটকের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মারামারির একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে প্রবাসে থাকা সুইটির এক বান্ধবী পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল কিংবা মামলার সর্বশেষ অবস্থা কী—এসব বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
সুইটির মা জহুরা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে মক্কায় বয়স্ক মানুষের সেবা করত। সে ঝগড়া করে না। অন্য মেয়েরা ঝগড়া করছে, তখন সুইটিরেও ধইরা নিছে।’ মেয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বাবা ফজল মিয়া বলেন, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে কষ্ট কইরা কামাই করি। সুখের আশায় ধারদেনা কইরা মেয়েকে বিদেশে পাঠাইছি। ছয় মাস ভালোই কাজকাম করল। তারপর থ্যাইকা আর খবর পাই না। অন্য সাইটে ঝগড়া হইছে, আর পুলিশ আমার মেয়েরে ধইরা নিছে।
প্রকৃত ঘটনা জানতে তদন্তের দাবি
প্রতিবেশী বিদ্যুৎ সাহা বলেন, সুইটির কী অপরাধ, তা তাঁরা জানেন না। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের সত্যতা যাচাই করে সুইটির বর্তমান অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানানো হোক। তিনি জীবিত থাকলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশ সুইটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি তাঁরাও শুনেছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। সুইটির বর্তমান অবস্থা, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলার চূড়ান্ত পরিণতি এবং শিরচ্ছেদের ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সরকারি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার। অনিশ্চয়তার এই সময়ে স্বজনদের একটাই আকুতি—মেয়ের প্রকৃত পরিণতি জানতে চান তাঁরা; আর যদি সুইটি বেঁচে থাকেন, তবে তাঁকে যেন দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়।
