বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৩ লাখ দিলেই চাকরি নিশ্চিত’—সেই সুমন ফের জাতীয় জাদুঘরে, প্রশ্ন উঠছে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ১০:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ঘুষের অডিও ফাঁসের পর বদলি, তদন্ত চলমান—সাড়ে তিন মাসেই আবার শাহবাগে; বোনের নিয়োগে ই-মেইল ব্যবহারের অভিযোগও সামনে। ফাইল ফটো

* বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ লাখ।

* টোটাল প্যাকেজ এক খরচেই।

* পরীক্ষায় পাস করারও কোনো প্রয়োজন নেই।

জাতীয় জাদুঘরে চাকরি দেওয়ার নামে ১৩ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে ফাঁস হওয়া এমন ফোনালাপ ঘিরে যে কর্মকর্তা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, সেই মো. সুমন মিয়াই আবার ফিরেছেন জাতীয় জাদুঘরে। প্রশ্ন উঠেছে—ঘুষের অভিযোগে বদলি, বিভাগীয় তদন্ত এবং বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগের মধ্যেই কী প্রক্রিয়ায় তাকে আবার শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে ফিরিয়ে আনা হলো?

জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুমন মিয়া গত এপ্রিল মাসে ঘুষ লেনদেনের একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। অভিযোগের পর তাকে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে বদলি করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়।

কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সেই সুমন মিয়াকে আবার জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। গত ১২ আগস্ট জাতীয় জাদুঘরের প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

‘১৩ লাখ দিলেই চাকরি’—ফাঁস হওয়া ফোনালাপে বিস্ফোরক দাবি

চলতি বছরের এপ্রিলে সুমন মিয়ার সঙ্গে এক চাকরিপ্রত্যাশীর কথোপকথনের ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১৩ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ ওঠে।

ফোনালাপে সুমন মিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ (১৩ লাখ)।

ঘুষের পরিমাণ কমানোর সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন। নিজেকে কেবল টাকা যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করে চাকরিপ্রত্যাশীকে প্রায় শতভাগ নিশ্চয়তার আশ্বাস দেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনালাপে সুমন বলেন, ‘টোটাল প্যাকেজ এক খরচেই। তোমার চিন্তা করার দরকার নাই। কী করা লাগবে, না লাগবে, তোমার জানার দরকার নাই এবং পরীক্ষায় পাস করারও কোনো প্রয়োজন নেই।

এই ফোনালাপ প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় জাদুঘরের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও সমালোচনা শুরু হয়।

৪৮ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

ফোনালাপ ফাঁসের সময় জাতীয় জাদুঘরের ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাওয়া ৪৮ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন’ দাবি করা হলেও বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।

অভিযোগের মুখে সুমন মিয়াকে তখন আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে বদলি করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে বদলি করা হয়েছিল, সেই অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন তাকে আবার জাতীয় জাদুঘরে ফিরিয়ে আনা হলো?

মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে তার এই প্রত্যাবর্তন নিয়েই এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বোনের নিয়োগেও উঠেছে প্রশ্ন

বিতর্কিত ৪৮ নিয়োগের তালিকায় সুমন মিয়ার নিজের বোন মোছা. তাসলিমা আক্তারের নামও রয়েছে বলে জানা গেছে।

তাকে ‘টেলিফোন অপারেটর’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার অনলাইন চাকরির আবেদনপত্রে সুমন মিয়ার ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সমালোচনা এড়াতে এবং ভাই-বোনের সম্পর্ক আড়াল করতে নিয়োগের পরপরই তাসলিমা আক্তারকে ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় বদলি করা হয় বলে অভিযোগ। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে টেলিফোন অপারেটরের কোনো পদ না থাকা সত্ত্বেও তাকে কীভাবে ওই প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হলো?

ফোনালাপ ফাঁসের ‘প্রতিশোধ’—গর্ভবতী নারী কর্মীকেও বদলির অভিযোগ

সুমন মিয়ার ঘুষ দাবির অডিও ফাঁসের ঘটনায় জুয়েল রানা নামের এক ব্যক্তির ওপর সুমন ও তার সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর জুয়েল রানাকে চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে বদলি করা হয়। একই সময়ে তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তারকেও—যিনি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন—আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে বদলি করা হয় বলে অভিযোগ।

অভিযোগের সময় সোনিয়া আক্তার অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তদন্ত কমিটিতেও প্রশ্ন

সুমন মিয়ার ঘুষ দাবির অডিও ফাঁসের পর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় জাতীয় জাদুঘরের কিপার (পরিচালক) মো. মনিরুল ইসলামকে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত ওই প্রক্সি পরীক্ষার সময় হল পরিদর্শকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। ফলে তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মালেক মিলন এবং সদস্য ছিলেন ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সমিরন রায়।

তদন্তে কী পাওয়া গেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সমিরন রায় আহ্বায়কের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। সদস্যসচিব মালেক মিলনও একই কথা বলেন।

অন্যদিকে কমিটির আহ্বায়ক মো. মনিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মহাপরিচালক ও সচিব এ বিষয়ে কথা বলবেন।

তদন্ত শেষ না হতেই প্রত্যাবর্তন—কার সিদ্ধান্তে?

সুমন মিয়াকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন করার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় জাদুঘরে ফিরিয়ে আনার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব ও সচিব মো. সাদেকুল ইসলামের নাম আলোচনায় এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে সচিব মো. সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব অবশ্য অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, অনেকেই তো অনেক কথা বলে। এগুলো সত্যি নয়। নিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ে যেসব কথা মানুষ বলে, এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।