শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

২০ চীনা যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা, জে-১০সিই কেনার খসড়া চুক্তি প্রস্তুত, আট অর্থবছরে পরিশোধ; ২০২৭ সালের মধ্যে আসতে পারে প্রথম ৬টি

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ২৬, ২০২৬ ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ছবি : সংগৃহীত

চীন থেকে চতুর্থ প্রজন্মের ২০টি জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এ জন্য খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ। সরকারের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যয় হতে পারে প্রায় ২ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। আট অর্থবছরজুড়ে অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।

২০টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ১০টি বিমানবাহিনীর ঘাটতি পূরণে (টিওঅ্যান্ডই) এবং বাকি ১০টি দিয়ে নতুন একটি স্কোয়াড্রন গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া এই উদ্যোগই এখন এগিয়ে নিচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

প্রতিটির দাম ৭৭১ কোটি টাকা

নথি সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো বিমানবাহিনীর চিঠিতে যুদ্ধবিমানগুলোর মূল্য এবং প্রশিক্ষণ ও পরিবহন-সংক্রান্ত সরঞ্জামের ব্যয় উল্লেখ করা হয়। প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের দাম ধরা হয়েছে ৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে প্রতিটি যুদ্ধবিমানের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৭৭১ কোটি টাকা। ২০টি বিমানের জন্য মূল ব্যয় হবে ১২৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ২০টি বিমান পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অপারেশনাল সরঞ্জাম বাবদ ব্যয় হবে ৮৮ লাখ ৮৩ হাজার ডলার। ছয়টি খাতে এই অতিরিক্ত ব্যয় হবে।

২০৩৪-৩৫ পর্যন্ত চলবে অর্থ পরিশোধ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বলা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাম্প্রতিক নথি বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর পর্যন্ত ক্রয় ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া চলবে।

প্রতিরক্ষা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ছয়টি জে-১০সিই পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশের। বাকি ১৪টি যুদ্ধবিমান পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে দেশে আসার কথা।

যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি রাডার-অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধবিমান কেনার কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে বিমানবাহিনী। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, এর সঙ্গে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, দূরপাল্লার রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং প্যাসিভ ডিফেন্স সিস্টেম কেনার কারিগরি মূল্যায়নও চলছে।

নথি অনুযায়ী, জে-১০ ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার ক্রয়ে গঠিত কমিটি দরকষাকষি বৈঠকের মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করে তা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠিয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিমানবাহিনীতে নতুন মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট ইউনিট গঠনের পাশাপাশি এয়ার ওয়ারফেয়ার সেন্টার ও ফিল্ড ইউনিট প্রতিষ্ঠা এবং বিমানবাহিনীর ঘাঁটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অ্যারোস্পেস গবেষণা ও উন্নয়ন কমপ্লেক্স স্থাপনের কিছু কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন।

বগুড়ায় পূর্ণাঙ্গ বিমানঘাঁটির পরিকল্পনা

নথিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিমানবাহিনীর উড্ডয়ন ও পরিচালন কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বগুড়ায় পূর্ণাঙ্গ বিমানঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।

চীন থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে অথবা চীনের যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট (সিএটিআইসি)-এর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত বছরের ৫ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্রয় প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে গত বছরের অক্টোবরে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও তখন সরাসরি নাকি জিটুজি পদ্ধতিতে কেনা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। সাম্প্রতিক নথিতে জিটুজি পদ্ধতিতে কেনার বিষয়টি উঠে এসেছে।

পুরোনো যুদ্ধবিমান নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধবিমানগুলোর বড় অংশই পুরোনো। আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এসব বিমান কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পেহেলগাঁও হামলার পর গত বছরের মে মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় ভারত। চার দিনের ওই সংঘাতে পাকিস্তান চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। ২০১০ সালে চুক্তির পর ২০২০ সালে পাকিস্তান এই মডেলের যুদ্ধবিমান পেতে শুরু করে।

ওই সংঘাতের পর জে-১০সিই নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। পাকিস্তান দাবি করে, চীনা জে-১০ ব্যবহার করে তারা ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভারতের কয়েকটি রাফাল হারানোর তথ্যও উঠে আসে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিমান ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

রাফালের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী

পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে প্রতি জে-১০সিই কত দামে কিনেছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। দেশটির সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রতি বিমানের দাম ৪ থেকে ৫ কোটি ডলার বলা হয়েছিল।

অন্যদিকে ভারত ২০১৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করে। অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট প্যাকেজসহ প্রতিটি রাফালের দাম প্রায় ২৪ কোটি ডলার হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পার্থক্যের কারণে তুলনামূলক কম ব্যয়ে আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে জে-১০সিই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আগে রাফাল-টাইফুন-এফ-১৬ নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশ অবশ্য ২০১৬ সাল থেকেই নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় সফরে এসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আগে ২০২১ সালে শেখ হাসিনার ফ্রান্স সফরের সময় রাফালের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাসো এভিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল।

আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—দুই ভূমিকাতেই সক্ষম

শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উড়তে সক্ষম জে-১০সিই যুদ্ধবিমান আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—দুই ধরনের অভিযানেই ব্যবহারের উপযোগী। বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধবিমান বহরের সক্ষমতা মূলত প্রতিরক্ষামুখী হওয়ায় নতুন এই যুদ্ধবিমানকে আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিমানবাহিনীতে কর্মরত সাবেক এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জে-১০সিই তুলনামূলক ছোট রানওয়ে থেকেও উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করে হামলা ও প্রতিরোধের সক্ষমতা রয়েছে এর। আকাশযুদ্ধে প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র এড়িয়ে চলার প্রযুক্তিও এতে রয়েছে।

জে-১০সিই ও রাফাল—দুটিকেই আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দুটির সক্ষমতা, রাডার, অস্ত্রব্যবস্থা ও অপারেশনাল সুবিধা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

‘গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে বাংলাদেশ’

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার জানান, জে-১০সিই ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার জন্য দরকষাকষি বৈঠকের খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করেছে সরকারের কমিটি।

তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় চীনের জে-১০ ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে জে-১০সিইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশ তাই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল প্রতিরক্ষা ক্রয়ে চূড়ান্ত চুক্তি, মূল্য, অর্থ পরিশোধের শর্ত এবং সরবরাহের সময়সূচিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।