মাদারীপুর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য, সম্পদের উৎস নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ফাইল ছবি
সরকারি চাকরির নবম গ্রেডের কর্মকর্তা। বেতন-ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাদারীপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন ও তার পরিবারের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫৯ কোটি টাকা।
সরেজমিন অনুসন্ধান, জমির নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
আগারগাঁওয়ে কর্মরত থাকাকালেই সম্পদের বিস্তার
হেলাল উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরে। তার স্ত্রী শাহিনা পারভীনও একই জেলার বাসিন্দা। বর্তমানে তারা রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পৈতৃকভাবে তাদের প্রায় ১০৪ শতাংশ জমি রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে তার অধিকাংশ সম্পদ গড়ে ওঠে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সময়। পরে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর তাকে মাদারীপুরে বদলি করা হয়।
শুধু জমিই নয়, পরিবারের নামে একাধিক ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের অভিযোগও উঠে এসেছে।
রাজধানীর ছয় এলাকায় জমি, বাজারমূল্য কয়েক ডজন কোটি টাকা
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, নিজের নামে এবং স্ত্রী ও শ্যালকের নামে মোট ৩৩.৮৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন হেলাল উদ্দিন।
নিজের নামে রয়েছে—
. গুলশান-ভাটারা এলাকায় ৫.৭৭ শতাংশ আবাসিক জমি।
. মোহাম্মদপুরে ৮.২৫ শতাংশ জমি।
. বাড্ডায় ১.৪ শতাংশ জমি।
সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলশানের জমিটির বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এছাড়া মোহাম্মদপুর ও বাড্ডার জমির সম্মিলিত মূল্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা।
স্ত্রীর নামে রয়েছে—
ধানমন্ডির রামচন্দ্রপুর-১ মৌজায় ৫.৫২ শতাংশ জমি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
যৌথ মালিকানায় রয়েছে—
. তেজগাঁওয়ের গজারিয়া-১ মৌজায় স্ত্রী শাহিনা পারভীনের সঙ্গে সাড়ে ৭ শতাংশ জমি, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।
. কেরানীগঞ্জের তারানগর মৌজায় শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে ৫.৪৫ শতাংশ জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পদের অভিযোগও রয়েছে
জমির পাশাপাশি আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে পরিবারের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা।
এছাড়া রাজধানীতে আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন মার্কেটে একাধিক দোকানে বিনিয়োগের অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে এসব সম্পদের পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
সাত ব্যাংক ও ১০টি মোবাইল আর্থিক অ্যাকাউন্টে লেনদেন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেলাল উদ্দিন ও তার পরিবারের আর্থিক লেনদেন হয়েছে অন্তত সাতটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ১০টি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।
হেলাল উদ্দিনের নামে রয়েছে—
ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক।
স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে রয়েছে—
পূবালী ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্ট, আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডে একটি অ্যাকাউন্ট।
এছাড়া নগদ ও বিকাশের অন্তত ১০টি অ্যাকাউন্টে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ঢাকায় আমার এত টাকা নেই’—হেলাল উদ্দিন
বেতন কাঠামোর সঙ্গে বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি হেলাল উদ্দিন।
তার ভাষ্য—
মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া কথা বলা মানা। ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই। যা আছে, তার ভ্যাট-ট্যাক্স সব দেওয়া আছে। এর বাইরে কেউ কিছু বললে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অধিদপ্তরের নীরবতা, দুদকে অভিযোগের পরামর্শ
বিষয়টি নিয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে লিখিত আবেদনের জবাবে সাংবাদিকদের দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
৫ আগস্টের পর থেকে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা হয়েছে। অভিযোগ এসেছে, তাই বিষয়টি তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবার প্রতিবেদনে উল্লেখিত সম্পদের তথ্য ও অভিযোগ অনুসন্ধানভিত্তিক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার বৈধ সম্পদের বিপরীতে ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন নজরে আসলে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
