গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন গ্রহণ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সমালোচিত এই কর্মকর্তাকে নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ২১তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও অধিদপ্তরের নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও টেন্ডার কার্যক্রমে তার প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এমনকি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কার্যত অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—প্রধান প্রকৌশলী, নাকি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের?
‘সুবিধাবাদী’ পরিচয়ের অভিযোগ
অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বদরুল আলম বিভিন্ন সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিশ্চিত করে আসছেন।
ঢাকা সার্কেলে পদায়ন ঘিরে নানা অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১-এ পদায়ন করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই পদায়নের পেছনে রাজনৈতিক তদবির ও আর্থিক লেনদেনের ভূমিকা ছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি প্রকাশিত হয়নি।
দুদকে জমা অভিযোগে শত কোটি টাকার সম্পদের দাবি
গত ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ে টেন্ডার, বদলি, কমিশন ও প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে—
* ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস কারখানা।
* গোড়ানে ছয়তলা বাড়ি।
* গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট।
* বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট।
* বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের এফডিআর।
* অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবসায়িক বিনিয়োগসহ নানা সম্পদ রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, হবিগঞ্জ, ভোলা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সাভারে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সরকারি নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ভোলা, ময়মনসিংহ ও সাভারে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে একাধিকবার তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাভার সার্কেলে টেন্ডার নিয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন
আরও অভিযোগ রয়েছে, সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি নির্দেশনার বাইরে গিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক
সম্প্রতি বদরুল আলম খানের স্ত্রী গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে অভিযোগ করেন, তার স্বামী পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং নিজের ও সন্তানদের নামে কোনো সম্পদ রাখেননি। একই সঙ্গে তিনি একাধিক ব্যক্তিগত অভিযোগও উত্থাপন করেন।
তবে এসব বক্তব্য সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত অভিযোগ; এগুলোর সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য যে, প্রতিবেদনে বর্ণিত বিষয়গুলো বিভিন্ন অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগতভাবে এখনো দোষী সাব্যস্ত হয়নি।
