মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: ফাইল
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র পাঠান। এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
পদত্যাগের আগে দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বিকেলে জাতীয় সংসদে জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন স্পিকার।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন রাষ্ট্রপতি
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন—
‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করি। অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন—
‘৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হয়। এ সংকট উত্তরণে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি নিজের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে লিখেছেন—
‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিকের জন্য অচেতন হয়ে যাই। এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
এছাড়া ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে?
জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দলটির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যেভাবে ঘটল পদত্যাগের নাটকীয় অধ্যায়
গত কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, তিনি পদত্যাগের বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন এবং বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বিদায়-সংক্রান্ত আলোচনা করেছিলেন।
এরই মধ্যে চিকিৎসা শেষে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শুক্রবার দুপুরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে দেশে ফেরেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা দেবেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই দায়িত্ব পালন করবেন।
মেয়াদ শেষের আগেই বিদায়
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। পাঁচ বছরের মেয়াদ অনুযায়ী তার দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই আলোচনা আরও তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন পরিবর্তনের সূচনা হলো।
