প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন, নিম্নমানের কাজ, কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে নতুন করে তোলপাড়। ফাইল ছবি
টাঙ্গাইল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পালকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, ঘুষ গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্বৈরাচার সরকারের সময় প্রথমে খাদ্যমন্ত্রী এবং পরে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক হুইপ মির্জা আজমের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে টাঙ্গাইলে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) থেকে পদোন্নতি নিয়ে একই জেলায় দুই দফায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন শম্ভু রাম পাল। ওই সময়ে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ধারাবাহিকভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থায়ন এবং অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে অর্থ পাচারের সঙ্গেও জড়িত। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টাঙ্গাইলে প্রথম দফার দায়িত্বেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম দফায় টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শম্ভু রাম পাল। ওই সময়ে মেসার্স নুরানী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, বিথী কনস্ট্রাকশন ও মৃত্তিকা এন্টারপ্রাইজকে এলটিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে একের পর এক সরকারি প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা কারাগার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল স্টেশন, সিজেএম আদালতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কখনও যৌথ উদ্যোগে (জেভি), আবার কখনও এককভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে নিম্নমানের নির্মাণকাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময় টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণে তিনজন শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর তাকে মেহেরপুরে বদলি করা হয় বলে জানা যায়।
মেহেরপুরেও একই অভিযোগ, পরে আবার টাঙ্গাইলে প্রত্যাবর্তন
সূত্র জানায়, মেহেরপুরে দায়িত্ব পালনকালেও মুজিবনগর প্রকল্প, জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় টাঙ্গাইলে ফিরে এসে আগের মতোই নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েন।
নতুন অর্থবছরেও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ
২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে টাঙ্গাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয় নির্মাণকাজ মৃত্তিকা এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে কাজটি নিশ্চিত করতে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হয়েছে।
একইভাবে জেলা কারাগারের পাঁচতলা সেল ভবন নির্মাণের টেন্ডারেও অনিয়মের মাধ্যমে স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ঘুষ, নকশা অনুমোদন ও ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ
দ্বিতীয় দফায় টাঙ্গাইলে যোগদানের পর থেকেই শম্ভু রাম পালের বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে রয়েছে—
. ঠিকাদার বাছাইয়ে পক্ষপাতিত্ব,
. বিল ছাড়ে কমিশন গ্রহণ,
. ঘুষের বিনিময়ে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন,
. নির্মাণকাজে যথাযথ তদারকি না করা,
. ভূমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ,
. নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে প্রশ্রয় দেওয়া।
মেডিকেল কলেজসহ একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উন্নয়ন প্রকল্প, চিকিৎসক আবাসন, ছাত্রাবাস, মসজিদ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেনেজ, সাবস্টেশন, জেনারেটর, লিফট, ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক অবকাঠামোসহ একাধিক প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন (ওভার এস্টিমেট), নিম্নমানের কাজ এবং কারিগরি অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রকল্প হস্তান্তরের অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং প্রতিবছর মেরামতের নামে নতুন করে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
বিলাসবহুল সম্পদের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চাকরি জীবনে অনৈতিকভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে শম্ভু রাম পাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বিপুল কৃষিজমি এবং টাঙ্গাইল শহরে একাধিক বাণিজ্যিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
ঠিকাদারদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, অনুমোদিত প্রাক্কলনের (Approved Estimate) গোপন কপি নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে সরবরাহ করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়। একজন ঠিকাদার দাবি করেন, একটি বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের কথা শুনেছেন। অন্য একজন ঠিকাদারের ভাষ্য, সুযোগ পেলে তিনি ১৫ লাখ টাকা দিয়েও কাজটি নিতে রাজি ছিলেন।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের সমর্থনের কারণে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে শম্ভু রাম পালের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
