মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আজিমপুর প্রকল্প ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি? পরিবেশ ধ্বংসের ঝুঁকিতে ৭৭৪ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প—বাস্তবায়নে মরিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম, নেপথ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ

কামরুল হাসান সোহাগ
জুলাই ২১, ২০২৬ ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির দক্ষিণাঞ্চলে পুরোনো ভবন ভেঙে ১১টি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে প্রায় ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে পরিবেশ ধ্বংস, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, নগর ব্যবস্থাপনার সংকট এবং ঠিকাদার-সংশ্লিষ্ট নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের জোন-সি এলাকায় ৯ দশমিক ২৬ একর জমির ওপর বিদ্যমান ৩২টি পুরোনো ভবন অপসারণ করে আধুনিক আবাসন কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এখানে ১১টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবনে মোট ৮৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ১ হাজার বর্গফুট। এছাড়া প্রায় ২১০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও পাঁচটি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮০০ বর্গফুট। প্রকল্পের আওতায় একটি ছয়তলা সার্ভিস ভবন, ১৫ হাজার বর্গফুটের মাল্টিপারপাস ভবন, ছয়তলা মসজিদ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পার্কিং ব্যবস্থা, মাস্টার ড্রেন, ফায়ার প্রটেকশন ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র সাবস্টেশন, ৩৭টি লিফট এবং ১৪টি জরুরি জেনারেটর স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

গাছ ও খোলা জায়গা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সম্প্রতি সরেজমিনে আজিমপুর সরকারি কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় ইতোমধ্যে মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেস্ট) কাজ শুরু হয়েছে। এলাকাজুড়ে এখনও বিপুল সংখ্যক পুরোনো ও দেশীয় প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাম্বল, ডেউয়া, তাল, কদম, রেইনট্রি, মেহগনি, জাম, কৃষ্ণচূড়া, আকাশমণি, আম, ডাব, কাঠবাদাম, অর্জুন, হরীতকী, সজনে, কড়ই, কাঁঠাল, বরই, পেয়ারা, চালতা, সুপারি, বেল, দেবদারু, পিপুল, পলাশ ও শিউলি—যাদের অনেকগুলো রাজধানীতে এখন বিরল।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই হাজারেরও বেশি গাছ কাটা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে, অধিকাংশ গাছ ভবনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় নির্মাণকাজ চলাকালে সেগুলো রক্ষা করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে এলাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ খেলার মাঠও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের প্রকল্পেই বেড়েছে জনচাপ, এবার কী হবে?

স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে আজিমপুরে ১৭টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের পর থেকেই এলাকায় জনসংখ্যার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফুটপাতের বড় অংশ বাজারে পরিণত হয়েছে, আর যানজট আজিমপুর ছাড়িয়ে নীলক্ষেত ও নিউমার্কেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, আবাসন বৃদ্ধি পেলেও সড়ক, পার্ক, মাঠ, ড্রেনেজ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সমানতালে বাড়েনি। ফলে নতুন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

পরিকল্পনাবিদদের প্রশ্ন—এটি কি টেকসই উন্নয়ন?

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, আজিমপুরের জনঘনত্ব বহু আগেই সহনীয় সীমা অতিক্রম করেছে। তার মতে, সরকারি আবাসন সম্প্রসারণের পাশাপাশি পার্ক, খেলার মাঠ, জলাশয় ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টো বিদ্যমান সবুজ পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে নির্মিত ১৭টি বহুতল ভবনের ফলে যে জনচাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার অনুপাতে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। একই ধারা অব্যাহত থাকলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও বসবাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‘নগরবাসীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাত’

স্থপতি ইকবাল হাবিবও প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বড় আকারের আবাসিক ভবন নির্মাণের ফলে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। অথচ এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রাকসমীক্ষার তথ্য জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হয়নি।

তিনি বলেন, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই উন্নয়ন হয় না। সেই ভবনের কারণে সৃষ্ট জনসংখ্যা ও সেবার চাপ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত মাঠ, পার্ক, বাজার, উপাসনালয় ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো প্রয়োজন। অন্যথায় এটি নগরবাসীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে পরিণত হতে পারে।”

সরকারের অবস্থান

তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গাছ কাটার আশঙ্কা নাকচ করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা কোষ) আবুল বাকের মো. তৌহিদ বলেন, গাছ কাটার কোনো পরিকল্পনা নেই। যেখানে পুরোনো ভবন রয়েছে, সেখানেই নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। গাছ কাটা হলে সেটি অবশ্যই খারাপ হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যে অনীহা

সামগ্রিক অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত আজিমপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে, তার পক্ষে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী তাওহীদ কামিয়াব যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, বক্তব্য নিতে হলে সাংবাদিককে অফিসে গিয়ে সব ডকুমেন্টস দেখাতে হবে। তবে অভিযোগের বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য কিংবা প্রয়োজনীয় নথি পাঠানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন আচরণকে অনেকেই তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও সরকারি চাকরি আচরণবিধির চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন।

উন্নয়ন নাকি পরিবেশের মূল্য দিয়ে প্রকল্প?

রাজধানীর অন্যতম সবুজ আবাসিক এলাকা আজিমপুর সরকারি কলোনিতে নতুন করে ১১টি বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা—এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই হাজারেরও বেশি গাছ হারিয়ে যেতে পারে, সংকুচিত হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ খোলা জায়গা ও মাঠ, আর বাড়তে পারে জনঘনত্ব ও নাগরিক সংকট।

এমন সময়ে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে, যখন সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথা বলছে। তাই পরিবেশ সচেতন মহলের প্রশ্ন—একদিকে বৃক্ষরোপণের ঘোষণা, অন্যদিকে রাজধানীর অন্যতম সবুজ অঞ্চলকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া—এই দ্বৈত অবস্থানের দায় নেবে কে? আর শেষ পর্যন্ত আজিমপুরের ৭৭৪ কোটি টাকার এই প্রকল্প—জনস্বার্থে, নাকি অন্য কোনো স্বার্থে—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

এসব অনিয়মের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গড়িমসি করছে। তবে সাংবাদিক কামরুল হাসান জনস্বার্থে দুদকের নজরে আনবেন বলে, ইদানিং এক বার্তায় এ ঘোষণা দিয়েছেন। এখন নজর থাকবে দুদকের দিকে।কি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, সেদিকে তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ