মুজিবুর রহমান খান। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর প্রায় ৩৫০.৮৮ কোটি টাকার “বিদ্যমান সার গুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নতুন গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ (২য় পর্যায়)” প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. মুজিবুর রহমান খান।
একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পটির আওতায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে মূলত আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং কমিশনভিত্তিক ঠিকাদার নিয়োগের কারণে। ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের প্রভাব ব্যবহার করে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান মুজিবুর রহমান খান। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, গোপন সমন্বয় ও পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি কার্যাদেশের বিপরীতে অগ্রিম প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হতো। এ কারণেই ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছে তিনি “মিস্টার ১০%” নামে পরিচিত বলে দাবি করেছেন একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও নামমাত্র কাজ করে বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় শেষ হলেও প্রকল্পের শতভাগ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা ও অনিয়মই এর অন্যতম কারণ।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ৩৫০.৮৮ কোটি টাকার প্রকল্পে বরাদ্দের বড় একটি অংশ ব্যয় হলেও বহু স্থানে সংস্কার ও নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক স্থানে কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, নন-নাইট্রোজেনাস সার সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা, কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গুদাম ও অফিস অবকাঠামোর উন্নয়ন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবায়নে সেই লক্ষ্য অনেকাংশেই অর্জিত হয়নি।
এদিকে, প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তা কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন চাপা ছিল। এমনকি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেসব জেলায় উঠেছে নির্মাণ অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন সার গুদাম নির্মাণ ও পুরোনো গুদাম সংস্কার করা হলেও বহু স্থানে নিম্নমানের কাজ এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
. রংপুর (আলমনগর): নতুন গুদাম নির্মাণে ডিপিপির বাইরে কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ।
. দিনাজপুর (বিরামপুর): ৭,২০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম ও অফিস ভবন নির্মাণে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ।
. ঠাকুরগাঁও: আধুনিক গুদাম নির্মাণে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন।
. সিরাজগঞ্জ (রায়গঞ্জ): প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার গুদাম নির্মাণে দরপত্রের শর্ত অনুসরণ না করার অভিযোগ।
. চুয়াডাঙ্গা: ২,৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদামে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ।
. নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ: নতুন গুদাম নির্মাণ উদ্যোগে অনিয়মের অভিযোগ।
. মানিকগঞ্জ: সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় দেশকে ২১টি অঞ্চলে ভাগ করে গুদাম নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মনোনীত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান খান বা বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য যে,এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নথি, দরপত্র পর্যালোচনার ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়ন কমিটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে গোটা সংশ্লিষ্ট মহলে।
মূল্যায়ন কমিটির ভূমিকা নিয়ে থাকছে আরো বিস্তারিত পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….
