সোমবার, ২০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, গণপূর্তের ই/এম কারখানা বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফের ‘কমিশন সিন্ডিকেট’—দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাব বাণিজ্যের বিস্তৃত অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই ২০, ২০২৬ ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না এবং অধিকাংশ সময় অফিসের বাইরে থেকেই বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত কমিশন ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না।

অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তা বর্তমানে নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে একটি কথিত ছাত্রসংগঠনের প্যাড ব্যবহার করে নিজের পরিচয় তুলে ধরার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, মো. ইউসুফ একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি, কমিশন আদায় এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন ছাড়া কোনো বিল বা ফাইল সহজে ছাড় হয় না।

এছাড়া, অতীতে এক ঠিকাদারের পাওনা বিল আটকে রাখার ঘটনায় থানায় অভিযোগ পর্যন্ত হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিল পরিশোধ করা হয় বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

কমিশন বাণিজ্য ও বিল উত্তোলনের অভিযোগ

গত অর্থবছরের শেষ দিকে কমিশনের অর্থ আদায়ে তিনি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজ সম্পন্ন না করেই পুরো বিল উত্তোলন এবং সেই অর্থ সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সূত্রগুলোর দাবি, ই/এম কারখানা বিভাগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যতম লাভজনক পোস্টিং হিসেবে পরিচিত। এ বিভাগে বদলি বা পদায়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এই বিভাগে আসার জন্যও মো. ইউসুফ বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন।

সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে এক ঠিকাদারের বিল আটকে রেখে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এখনও সম্পূর্ণ বিল পাননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও প্রকল্পটি প্রায় দুই বছর আগে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সিন্ডিকেটের প্রভাব

অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়; নিয়োগ, বদলি ও পদায়নেও তাদের প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি সিন্ডিকেটের এক সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।

এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার অভিযোগও রয়েছে।

উপদেষ্টার নাম ভাঙানোর অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, অতীতে যেমন বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রধান প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করা হতো, তেমনি বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টার নামও ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এমনকি উপদেষ্টার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী ইউসুফের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগ

ট্রান্সফরমার নিলাম নিয়ে অভিযোগ

গত ৯ আগস্ট নিলামের মাধ্যমে তিনটি ট্রান্সফরমার বিক্রির ঘটনায় মাত্র ১৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেখিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১১২ ফ্ল্যাট প্রকল্প

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য ১১২ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা মূল্যের পাম্প মোটর সেট এবং প্রায় ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের সিসিটিভি সিস্টেম সরবরাহের বিল জুন ক্লোজিংয়ের আগে পুরোপুরি পরিশোধ করা হলেও প্রকল্পের কাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট

বিশেষ বরাদ্দের ২১ লাখ ৬১ হাজার ২৫০ টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত ও পুনর্বাসনের নামে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে পুরো বরাদ্দ ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগ উঠেছে।

জাতীয় আর্কাইভ ও লাইব্রেরি ভবন

প্রায় ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে এলইডি টিভি, ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লে, ওয়াকিটকি, অডিও রেকর্ডারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের কাজে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রকল্প

প্রায় ৫৪ লাখ ১০ হাজার ৯৭৮ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পে ফায়ার সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, এসি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে উপসহকারী প্রকৌশলী মিল্টন কুমার দাসের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে বেনামি ঠিকাদারি, কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। সহকর্মীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত মালামাল কিনিয়ে তা অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

এক ঠিকাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ছোট প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অতিরিক্ত অংশ অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হয়েছে।

সহকর্মীদের অভিযোগ, মাত্র ১১ বছরের চাকরি জীবনে অবৈধ অর্থে গ্রামের বাড়িতে বিপুল সম্পদ, মার্কেট এবং ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন তিনি।

ইতোপূর্বে আরও যেসব প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ ছিল-

অভিযোগে বলা হয়েছে, পিএসসি প্রিন্টিং প্রেস, ১১২ ফ্ল্যাট প্রকল্প, এনএমএসটি, তালতলা ও আগারগাঁও সরকারি কলোনি, আবহাওয়া অধিদপ্তর, বিডা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর, এনআইএমএইচ, এনআইসিভিডি, এনআইকেডিইউ, টিবি হাসপাতাল, নিটোর, শিশু হাসপাতাল, এনবিআর, বিটিআরসি, বিআইসিসি, এসএমআরসি, স্পারসো, ডিটিই ভবন, ইপিবি ভবন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বিভিন্ন ন্যাম ভবন, বিআইএম ভবন, আগারগাঁও নিউ কলোনি, এনজিও ব্যুরো ভবন, জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ৪৪৮ ফ্ল্যাট প্রকল্প এবং এনআইএলজিসহ অসংখ্য স্থাপনার বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের আদ্যোপান্ত বিষয়ের ওপর বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ