দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স। কোটি কোটি প্রবাসী শ্রমিকের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপরই অনেকাংশে সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা। অথচ সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই আজ অভিযোগ করছেন, প্রতারক রিক্রুটিং চক্রের কাছে তারা জিম্মি। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ (আরএল-২৬৯২)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ উঠলেও, ভুক্তভোগীদের দাবি—এখনও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
প্রতারণার অভিনব কৌশল, অনিশ্চয়তায় প্রবাস জীবন
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ সৌদি আরবে পাঠালেও অনেকের জন্য বৈধ কর্মসংস্থান কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বহু শ্রমিক সেখানে অবৈধ অবস্থানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার, জরিমানা কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ, মানিকগঞ্জ ওভারসীজ (আরএল-১৪৯৭) এবং নয়ন ওভারসীজ (আরএল-১৮৬৬)-এর সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রবাসীদের বিদেশে পাঠিয়ে নানা অনিয়মের মাধ্যমে তাদের চরম দুর্ভোগে ফেলছে।
সরকারি নির্দেশনারও তোয়াক্কা নেই
ক্ষতিগ্রস্তরা আইন অনুযায়ী বিএমইটি এবং জেলা কর্মসংস্থান অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগের পর বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করলেও, ভুক্তভোগীদের দাবি—অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা কার্যকর করেনি।
বরং নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীদের আর ডাকা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারি তদারকি, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দায় স্বীকার, কিন্তু ক্ষতিপূরণ অধরাই
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা অন্য এজেন্সি থেকে ভিসা কিনেছিলাম। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা আছে এবং আমরা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।
তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় পার হলেও ক্ষতিপূরণের বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে জেলা কর্মসংস্থান অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় বিষয়টি বিএমইটি সদর দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ফলে ভুক্তভোগীদের ভাষায়, “বিচারের বদলে চলছে শুধু ফাইল চালাচালি।
রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রবাসীদের প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি তার বৈধ নাগরিক এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও দীর্ঘ সময় বিচার না পাওয়া এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে। তারা জানতে চান, রাষ্ট্র যদি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তারা কার কাছে বিচার চাইবেন?
ভুক্তভোগীদের দাবি
সৌদি আরবে বৈধতা সংকটে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা তাদের ইকামা নবায়নের ব্যয় সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বহনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—
* অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা।
* প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
* ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
* বিদেশে অবস্থানরত ভুক্তভোগীদের বৈধতা সংকট সমাধানে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা।
এদিকে প্রবাসীদের আস্থা রক্ষা করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অভিযোগগুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের আস্থার সংকট দেশের অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য যে, বর্তমানে দুদক রিক্রুটিং এজেন্সির উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েক’শ এজেন্সির সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে দুদক কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে পারেন সেদিকেই তাকিয়ে আছে লাখো রেমিট্যান্স যোদ্ধা।হয়ত তাদের অব্যক্ত কান্না আর বুকের ভেতর লুকানো কষ্টের লাঘব ঘটাতে পারে এমনটাই ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।
