রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর-ই খোদাকে ঘিরে উঠেছে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ দুই দশকের সরকারি চাকরির আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য, যা এখন রাজউকের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজউকের ভেতরে নূর-ই খোদাকে অনেকে ‘খলিফা’ নামে চেনেন। কারণ, ড্যাপ (DAP) সংশ্লিষ্ট নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তার স্বাক্ষর ছাড়া কোনো ফাইল অগ্রসর হয় না বলেই অভিযোগ রয়েছে। এই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই বছরের পর বছর গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী নকশা অনুমোদনের জন্য ঘুষের হারও নির্ধারিত ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, ১ থেকে ৬ তলা ভবনের জন্য প্রায় ১০ লাখ, ৬ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ২০ লাখ এবং ২০ তলা পর্যন্ত ভবনের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হতো। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। সংশ্লিষ্ট অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করত বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
দুই দশকের চাকরিতে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গঙ্গাপাড়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নূর-ই খোদা ২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে রাজউকে যোগ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ২১ বছরের চাকরিজীবনে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর উত্তরায় তার একটি বহুতল ভবন রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া সাভার-আশুলিয়ায় শত শত বিঘা জমি, একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তার পরিবারের নামে ইটভাটা, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, রাইস মিল, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, ফুড প্রসেসিং কারখানাসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এসব সম্পদের একটি অংশ আত্মীয়দের নামে পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকে লিখিত অভিযোগ
গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রাজধানীর ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা জাবেদ শেখ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তার অস্বাভাবিক সম্পদ, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়।
রাজউকের ভেতরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নূর-ই খোদা ফাইল আটকে রেখে ঘুষের দর-কষাকষি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, নকশা অনুমোদনের নামে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকা আদায় করা হতো।
আরও কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে রাজউকের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নূর-ই খোদা তাদের অন্যতম।
নূর-ই খোদার বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নূর-ই খোদা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার সম্পদ থাকলে তা আপনি নিয়ে নেন।
এছাড়া আবাসন কোম্পানির সঙ্গে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন।
রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আলোচনায়
রাজউকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় নকশা অনুমোদন, জমি সংক্রান্ত সেবা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম ও ঘুষের চিত্র উঠে আসে।
দুদকের আগের অনুসন্ধানেও প্লট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন, লিজ ডিড, জমির রেকর্ড পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব এবং বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের তথ্য উঠে এসেছিল।
সম্প্রতি রাজউকের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে দুদক একাধিক মামলা ও তদন্ত কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে রাজউক প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের কথা জানানো হয়েছে।
রাজউকের অবস্থান
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে ৪৮ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, ১৮ জনকে বদলি এবং সব সেবা ধাপে ধাপে অনলাইনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নকশা অনুমোদন ব্যবস্থাও ডিজিটাল করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনও তদন্তাধীন বা অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত। তাই অভিযোগগুলোর পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এসব অনিয়ম, দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তীতে আপডেট তথ্য নিয়ে থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……
