চাপাতির নৃশংস হামলায় নিহত বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর; হামলাকারীদের তিনজনই আটক, খুঁজে দেখা হচ্ছে কার নির্দেশে হয়েছিল হত্যাকাণ্ড।নিহত বিএনপই নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর (৫২)
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর (৫২) হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, হামলাকারীরা ঢাকা থেকে ভাড়াটে খুনি হিসেবে মিঠামইনে এসেছিল এবং পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।
গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাহাঙ্গীরকে। এ সময় তাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন স্থানীয় বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া (৩৮)। তিনি বর্তমানে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আটক তিনজন হলেন— বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর এলাকার নূর হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার নাগমুদ বাজার মধ্যপাড়া এলাকার শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক তিনজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তারা হত্যার উদ্দেশ্যে তিন দিন আগে ঢাকা থেকে মিঠামইনে আসে।
তিনি জানান, হামলার পর স্থানীয়দের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকেই একজনকে আটক করা হয়। পরে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে বুধবার গভীর রাতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, কারা তাদের ভাড়া করেছিল এবং এর পেছনে কারা রয়েছে—সেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের অতীত অপরাধের রেকর্ডও যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এটি একটি বড় ও স্পর্শকাতর ঘটনা। তাই মামলার প্রস্তুতি ও তদন্তে প্রয়োজনীয় সময় নেওয়া হচ্ছে।
নিহত জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আলমগীর হোসেন জানান, শুক্রবার বাদ জুমা মিঠামইনের পারিবারিক কবরস্থানে জাহাঙ্গীরকে দাফন করা হবে।
যেভাবে ঘটেছিল হামলা
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে মিঠামইন সদর বাজার থেকে বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়াকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। বাড়ির কাছাকাছি বেড়িবাঁধ এলাকায় তার বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছালে তিনজন ধারালো চাপাতি নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলায় জাহাঙ্গীরের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপ দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ও হাদিস মিয়াকে উদ্ধার করে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হাদিস মিয়া এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত হাদিস মিয়ার বড় ভাই আজিজুল কবির জানান, হাদিস কোনো কমিটিতে না থাকলেও বিএনপির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। হামলার সময় তিনি সাহসিকতার সঙ্গে এক হামলাকারীকে জাপটে ধরে ফেলেন। তখন হামলাকারীরা তার মাথা, হাত ও পায়ে চাপাতি দিয়ে তিনটি কোপ দেয়। এরপরও তিনি হামলাকারীকে ছাড়েননি। পরে স্থানীয় লোকজন এসে ওই হামলাকারীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
বিএনপির ক্ষোভ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এমপি জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা হত্যাকারী ও হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আগের মামলার পর আবারও আলোচনায় জাহাঙ্গীর
উল্লেখ্য, মিঠামইনের বেড়িবাঁধের সরকারি ২০টি মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগে প্রকৌশল অফিসের দায়ের করা মামলায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। একই দিনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব সাংগঠনিক পদ স্থগিত করা হয়।
প্রায় এক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে গত ৫ জুলাই তার সভাপতির পদের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তবে সেই প্রত্যাহারের চিঠিটি তার মৃত্যুর পর জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
