ওমরা ও ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে সক্রিয় মানবপাচার সিন্ডিকেট, তদন্তের কেন্দ্রে বেবিচকের কর্মকর্তা আব্দুল বারী মোল্লা। ফাইল ছবি
ওমরা ও ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে মানবপাচারের অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল ও বৈধ ভিসার অপব্যবহার করে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছে। পরে এসব যাত্রী কাতার, মিসর কিংবা সিরিয়া হয়ে নৌপথে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অ্যারোড্রাম অপারেটর আব্দুল বারী মোল্লা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে বেবিচক। তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে তদন্তের কেন্দ্রে এলেন বারী মোল্লা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর চারজন অবৈধ যাত্রীকে ইমিগ্রেশন পুলিশ অফলোড করার পরই মানবপাচার চক্রের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। নজরদারিতে উঠে আসে জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশে যাত্রী পাঠানোর একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের তথ্য।
সূত্রগুলোর দাবি, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বারী মোল্লা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি, ইমিগ্রেশন পুলিশের অসাধু সদস্য এবং কয়েকটি এয়ারলাইন্সের কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০ জন, কখনও এরও বেশি যাত্রী বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। তদন্তে এমন তথ্যও এসেছে যে, গত বছরের ২১ অক্টোবর একদিনেই প্রায় ৩০ জন যাত্রীকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, যাত্রীদের পাসপোর্ট, টিকিট, কোড নম্বর আদান-প্রদান এবং অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের হাতে এসেছে।
অভিযানে জব্দ মোবাইল, মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
চলতি বছরের ৩০ মার্চ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে অভিযান চালায় এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স। পাঁচজন বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিকে আটকের পর প্রায় নয় ঘণ্টার অনুসন্ধানে চক্রটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বারী মোল্লা নিজের ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি টাওয়ার ভবনের একটি ক্যান্টিনে লুকিয়ে রাখেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ফোনটি উদ্ধার ও জব্দ করা হয়।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, জব্দ করা মোবাইলে ইমিগ্রেশন পুলিশ, ট্রাভেল এজেন্সি, কয়েকটি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের সঙ্গে পাসপোর্ট, টিকিট ও কোড নম্বর আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না বলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
আড়াল ভেঙে ফের সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ
সূত্রগুলোর দাবি, ওই ঘটনার পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও বারী মোল্লা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
গত ৫ জুলাই জাল ভিসায় মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের একটি চেষ্টার ঘটনায় একই চক্র আবারও গোয়েন্দাদের নজরে আসে। বোর্ডিং পাস নেওয়ার পর গোয়েন্দা তৎপরতার খবর পেয়ে অনেকেই পালিয়ে যান। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, এই ঘটনাতেও বারী মোল্লার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইমিগ্রেশন ও এয়ারলাইন্সের কিছু কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, যাত্রীদের কোড সরবরাহ এবং অর্থের বিনিময়ে ইমিগ্রেশন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বারী মোল্লার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তিনি ঢাকা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের কয়েকটি মানবপাচার চক্রের বিমানবন্দর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইন্ডিগো, সৌদি এয়ারলাইন্স, এয়ার ইন্ডিয়া, জাজিরা এয়ারওয়েজ ও সালাম এয়ারের কিছু কর্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি। কোন সময়ে, কীভাবে যাত্রী বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং অবৈধ লেনদেনের বিভিন্ন তথ্যও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, বারী মোল্লার বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে যা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে মানবপাচারের ঘটনা নতুন নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকেন, তবে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা জরুরি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, মানবপাচার রোধে সংস্থাটি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কাউন্টারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কোনও কর্মীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দর ব্যবহার করে মানবপাচারের ঘটনা ঘটে, কারণ বিভিন্ন দেশ থেকে ডিপোর্ট হয়ে যাত্রীরা ফিরে আসেন। তবে যাত্রীদের কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।
উল্লেখ্য, অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলমান। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
