রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সদ্য সাবেক প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও জুলাই আন্দোলনের সময় কারাগারে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য পাচার, মাদক সরবরাহ, মোবাইল সুবিধা বাণিজ্য, জামিন সিন্ডিকেট, কারা পুলিশ নিয়োগে অনিয়ম এবং কারাগারের ভেতরে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ এখন কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ছামিউলের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে রংপুর কারাগারে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে স্বচ্ছল বন্দীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার, বিশেষ সুবিধা, হাসপাতাল রেফার, এমনকি মাদকাসক্ত বন্দীদের কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুতর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
কারাগারে ‘অলিখিত রাজত্ব’ গড়ে তোলার অভিযোগ
সূত্র বলছে, ২০০২ সালে বগুড়া কারাগারে কারারক্ষী হিসেবে যোগদান করা ছামিউল ইসলাম চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে বগুড়া, রাজশাহী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী ও পঞ্চগড় কারাগারে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রধান কারারক্ষী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি কারাগারে প্রভাব বিস্তার করে কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজবন্দীদের ওপর মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ
তদন্তে যুক্ত সূত্রগুলোর দাবি, জুলাই আন্দোলনের আগে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মী কারাগারে গেলে তাদের পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ না দিলে বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে ফেলে মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা একাধিক সাবেক বন্দী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন অভিযোগ করেছেন।
রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের অভিযোগ
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কারাগারের অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর তথ্য এবং বন্দীদের বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাইরে পাচারের অভিযোগও তদন্তাধীন। বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দীদের বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ছামিউলের বিরুদ্ধে।
বিদ্রোহ ও ‘মব’ তৈরির অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি বছরের ঈদুল আজহার সময় ছুটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কারারক্ষীদের সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ ও কারা গোয়েন্দা ইউনিট বিষয়টি শনাক্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় কারাগারে সংঘটিত বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডেও ছামিউলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জামিন বাণিজ্যের অভিযোগ
তদন্ত সূত্রের ভাষ্য, আদালত এলাকার কয়েকজন মুহুরির মাধ্যমে কারাগারে একটি জামিন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোন বন্দীর জামিন হবে, সেই তথ্য আগেই সংগ্রহ করে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতো। টাকা না দিলে পুনরায় গ্রেপ্তারের ঝুঁকির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্বচ্ছল বন্দীদের বিশেষ সুবিধা
অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু বন্দীকে একাধিকবার মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতো। এছাড়া বিকাশ লেনদেনেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বন্দীদের চিকিৎসা ও হাসপাতাল রেফারকে কেন্দ্র করেও একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার তথ্য তদন্তে এসেছে।
মাদক সরবরাহের অভিযোগ
তদন্তে উঠে এসেছে, কারাগারে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী মাদকাসক্ত বন্দীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মাদক সরবরাহ করা হতো। প্রধান কারারক্ষী হওয়ার কারণে নিরাপত্তা তল্লাশি এড়িয়ে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
বারবার বদলি, বরখাস্ত ও সতর্কবার্তা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৪ বছরের চাকরি জীবনে বিভিন্ন অভিযোগে ছামিউল ইসলাম দুই দফা সাময়িক বরখাস্ত, একাধিক প্রশাসনিক বদলি এবং অন্তত পাঁচবার সতর্কতামূলক নোটিশ পেয়েছেন। এরপরও তিনি প্রধান কারারক্ষীর পদে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রশাসনিক বদলি ও তদন্ত
রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার এএসএম কামরুল হুদা গত ১৮ জুন প্রশাসনিক কারণে ছামিউল ইসলামকে বদলির জন্য বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে কারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে উস্কানি, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।
পরে তদন্তের স্বার্থে তাকে পঞ্চগড় কারাগারে বদলি করা হয়। বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক কামাল হোসেন জানিয়েছেন, তার দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থার জন্য কারা মহাপরিদর্শকের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার পরিবারের
ফোন জব্দ থাকায় ছামিউল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার পরিবারের দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগগুলোর অনেকগুলোই তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে এগুলো প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচিত নয়।
