আজ দুপুরে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর চালায় সন্ত্রাসীরা। ছবি-সংগৃহীত
চট্টগ্রাম নগরের বাণিজ্যিক অঙ্গনে আবারও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ। একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। দাবি পূরণ না করায় ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মাথায় প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১১ জুলাই বিদেশি একটি নম্বর থেকে ডিডিএন (DDN) ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুনের কাছে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তে নিজেকে সাজ্জাদ গ্রুপের সহযোগী ডেবিট ইমন পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন—
আমি সাজ্জাদ গ্রুপের ডেবিট ইমন। এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন, আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা। না হলে এখন থেকে আপনি আর ব্যবসা করতে পারবেন না। আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। বেশি দূর যেতে হবে না, পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেই জেনে নেবেন আমি কে। আপনাকে দুই দিন সময় দিচ্ছি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হুমকি উপেক্ষা করায় সোমবার দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি মুখোশধারী দল নগরের চকবাজারের এক্সেস রোডে অবস্থিত ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়।
মাত্র তিন মিনিটে তাণ্ডব
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কারও হাতে ছিল চাইনিজ কুড়াল, কারও হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি। তারা অফিসে থাকা কম্পিউটার, মনিটর, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য অফিসে রাখা ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রিদোয়ানুল কবির জানান, সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা অফিসের বিভিন্ন কক্ষে তাণ্ডব চালায়। কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পুরো ঘটনা মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায়।
মালিকের দাবি—হুমকির সঙ্গে হামলার সরাসরি যোগসূত্র
ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ব্যবসা বন্ধ করতে বলা হয়। অন্যথায় এককালীন ২ কোটি টাকা ও মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তিনি দাবি করেন, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত ডেবিট ইমন বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং তিনি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ফোনালাপে একের পর এক হুমকি
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ফোনালাপে ডেবিট ইমন বলেন, এতদিন ব্যবসা করেছেন, এখন থেকে আমরা করব। ব্যবসা করতে হলে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে। না হলে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। পুরো চট্টগ্রাম শহরে গার্মেন্টস থেকে ইন্টারনেট, সব জায়গায় আমাদের লোক ব্যবসা করছে। স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের বাসায় কী হয়েছে, দেখেছেন তো?
পুলিশের বক্তব্য
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান প্রমাণিক বলেন, হামলা ও হুমকির অডিও-ভিডিও পুলিশের হাতে এসেছে। পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর হোসেন মামুন বলেন, হামলায় জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগেও উঠেছিল একই ধরনের অভিযোগ
এর আগে ৯ মে, এক সাংবাদিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ডেবিট ইমনের বিরুদ্ধে।
এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি, পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে পরপর দুই দফা গুলি চালানোর ঘটনায়ও তদন্তে ডেবিট ইমনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা যায়।
কে এই ডেবিট ইমন?
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোবারক হোসেন ওরফে ডেবিট ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই ফোনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাসহ কমপক্ষে সাতটি মামলা রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার সঙ্গে ৫০ জনের বেশি শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে এবং আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ।
