কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত, জাহাজ মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং রাজনৈতিক প্রভাবে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন আল ফয়সালকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া মেরামত বিল, ওভার এস্টিমেট, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার, ঠিকাদার সিন্ডিকেট এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের একাধিক গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন প্রকল্প ও জাহাজ মেরামতের কাজে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক এই শিক্ষার্থী ছাত্রজীবনে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সেই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে চাকরিজীবনে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত, কোটি টাকার মালামাল কেলেঙ্কারির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে বিআইডব্লিউটিএতে যোগদানের পর মামুন আল ফয়সাল ‘প্রত্যয়’, ‘নির্ভীক’, ‘দুরন্ত’ ও ‘দুর্বার’ নামের উদ্ধারকারী জাহাজে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময় উদ্ধার ইউনিটগুলোর যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী একটি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে বিদেশে বসে গোপন আর্থিক সমঝোতা ও কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে নির্ধারিত মানসম্পন্ন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নমানের এবং চাহিদার তুলনায় অনেক কম সরঞ্জাম গ্রহণ করা হয়। পরে এসব মালামাল খানপুর স্টোরে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং পূর্ণাঙ্গ তালিকাও প্রস্তুত করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের একটি উদাহরণ।
জাহাজ মেরামতের নামে ‘ভুয়া বিল’, কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল নৌবহরের এমএমই (MME) বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন জলযান মেরামতের নামে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ নৌ মেরামত কেন্দ্রে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি জাহাজের মেরামত কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে ওভার এস্টিমেট তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাগজে-কলমে লাখ লাখ টাকার মেরামতের অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে জাহাজে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজই করা হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিম্নমানের যন্ত্রাংশের সিন্ডিকেট ও ঠিকাদারপ্রীতির অভিযোগ
বিভিন্ন জাহাজের স্টাফ, মাস্টার ও ড্রাইভারদের অভিযোগ, ভালো অবস্থায় থাকা যন্ত্রাংশ অকারণে বাতিল করে নির্দিষ্ট সরবরাহকারীদের মাধ্যমে নিম্নমানের চীনা যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হতো।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব যন্ত্রাংশ অল্প সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ত। পরে আবার নতুন করে মেরামতের এস্টিমেট তৈরি করে একই কাজের জন্য বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় দেখানো হতো। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পদ্ধতিতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নিজের পছন্দের নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও চেকের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করতেন মামুন আল ফয়সাল।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিআইডব্লিউটিএর জাহাজ মেরামত, যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং সরঞ্জাম সরবরাহ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আদালতের রায়ের মাধ্যমে সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মামুন আল ফয়সালের বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে তা একইভাবে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। তবে পরবর্তীতে বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
