বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। পান্থপথের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে নগদ অর্থ লেনদেনের দাবি, অতীত কর্মস্থলেও কাঠ পাচার ও প্রকল্পের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ। ফাইল ছবি
গণ-অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে তা ক্রমেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়মের লাগাম টেনে ধরতে না পারায় জনমনে বাড়ছে হতাশা। একশ্রেণির দালাল, তদবিরবাজ, রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধাভোগী এবং অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি বিভিন্ন খাতে পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসছে।
এবার এমনই এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তরকে ঘিরে। খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে ৫০ লাখ টাকার আর্থিক চুক্তির অভিযোগ উঠেছে কর্মকর্তা তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় একটি ব্যবসায়িক কার্যালয়ে নগদ অর্থ লেনদেনের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রজ্ঞাপন ঘিরে বিতর্ক, আলোচনায় তারিকুলের পদায়ন
গত ১৪ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-৩ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মাহমুদা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়। সূত্রের দাবি, তিনি এখনো ডিএফও পদে নিয়মিত পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নন; চলতি দায়িত্বে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর থেকেই তাঁর পদায়ন নিয়ে বন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছুদিন আগে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের তৎকালীন ডিএফও ফরিদ মিঞা অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ায় পদটি শূন্য হয়। তবে পদটি শূন্য হওয়ার আগেই একটি প্রভাবশালী মহল পছন্দের কর্মকর্তাকে সেখানে পদায়নের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
৫০ লাখ টাকার চুক্তি, পান্থপথে নগদ লেনদেনের দাবি
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, খাগড়াছড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বন বিভাগে পদায়ন নিশ্চিত করতে তারিকুল ইসলামের সঙ্গে ৫০ লাখ টাকার একটি আর্থিক চুক্তি হয়। এ প্রক্রিয়ায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের সম্পৃক্ততার কথাও দাবি করেছে সূত্রটি।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অক্টোবর রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় মোনায়েম টাওয়ারের কাছাকাছি এক প্রভাবশালী নেতার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে নগদ অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয়। কথিত এই লেনদেনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মন্ত্রণালয় ও বন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি, অর্থ লেনদেনের স্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
আগের কর্মস্থল ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ
তারিকুল ইসলামের অতীত কর্মজীবন নিয়েও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তিনি এর আগে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মাটিরাঙ্গা রেঞ্জে ফরেস্ট রেঞ্জার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধ জোতের আড়ালে বিপুল পরিমাণ কাঠ পাচারের ঘটনা ঘটেছিল এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে এমন অভিযোগের কথা জানা গেলেও এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি বা তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি।
পরবর্তী সময়ে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগে প্রায় সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই সময়ে ‘সুফল প্রকল্পের’ উন্নয়নকাজ থেকে ৫ শতাংশ হারে কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অভিযোগের সঙ্গে কথিত অবৈধ উপার্জনের বিষয়টি জড়িত এবং সেই অর্থের একটি অংশ খাগড়াছড়িতে পদায়নের তদবিরে ব্যয় করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আর্থিক নথি, প্রকল্পের বিল-ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
সংবেদনশীল পার্বত্য বন বিভাগে পদায়ন নিয়ে ক্ষোভ
খাগড়াছড়ি বন বিভাগ ভৌগোলিক অবস্থান, বনসম্পদ ও প্রশাসনিক বাস্তবতার কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। পার্বত্য অঞ্চলের বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, অবৈধ কাঠ পাচার প্রতিরোধ এবং বনভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তারিকুল ইসলামের পদায়ন নিয়ে বন প্রশাসনের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত না করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, খাগড়াছড়ি বন বিভাগে তারিকুল ইসলামের পদায়ন বন অধিদপ্তরের জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। একজন অদক্ষ ও বিতর্কিত কর্মকর্তা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সেখানে যাওয়ার অর্থ হলো পুরো বন বিভাগকে গ্রাস করা। সেখানে একজন সাহসী, চৌকস ও সৎ কর্মকর্তার পদায়ন অত্যন্ত জরুরি ছিল।
তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পদায়নটি ঘিরে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ও দাপ্তরিক ব্যাখ্যাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বনসম্পদের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও পদে তারিকুল ইসলামের পদায়নের প্রক্রিয়া, কথিত ৫০ লাখ টাকার চুক্তি, পান্থপথে অর্থ লেনদেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পদায়ন পুনর্বিবেচনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তারিকুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিএফও তারিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদকের প্রশ্ন ও অভিযোগ শোনার পর তিনি কোনো মন্তব্য না করেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এখন প্রশ্ন—খাগড়াছড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ বন বিভাগে পদায়ন ঘিরে ওঠা ৫০ লাখ টাকার কথিত আর্থিক চুক্তির অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? কারা এই পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন? কথিত অর্থ লেনদেনের পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন বন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষতাপূর্ণ তদন্ত।
