দুই পাশ দিয়ে চলছে গাড়ি, মাঝখানে অপেক্ষায় কিছু যানবাহন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। ছবি: এএফপি
রাজধানীতে চালু হওয়া এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থাকে হাতিয়ার বানিয়ে সক্রিয় হয়েছে নতুন এক সাইবার প্রতারক চক্র। মোবাইলে আসছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া মামলা সংক্রান্ত এসএমএস, আর সেই আতঙ্কের সুযোগ নিয়েই সাধারণ মানুষের ব্যাংক কার্ডের গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ভয়ংকর ফাঁদ পেতেছে তারা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতারণার পুরো খেলাটি শুরু হচ্ছে একটি এসএমএস দিয়ে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে— এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রমাণ ধরা পড়েছে এবং জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব বার্তা পাঠানো হচ্ছে বিদেশি নম্বর থেকে। ব্যবহৃত হচ্ছে +৬৩ কোডযুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নম্বর— +63 948 331 8282, যা ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোড।
গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে এআই-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা চালু করে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের মালিককে শনাক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আর সেই বাস্তব ব্যবস্থাকেই ঢাল বানিয়ে প্রতারকরা মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করছে।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি এমন ভুয়া এসএমএস পাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। এক মোটরসাইকেল চালক ও কনটেন্ট নির্মাতা ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করে জানান, যে তারিখে তার বিরুদ্ধে মামলা দেখানো হয়েছে, সেদিন তার মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। অথচ ঢাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে তাকে জরিমানার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন— গাড়ি না চালিয়েও কীভাবে মামলা হয়, আর কেন সরকারি নোটিশ বিদেশি নম্বর থেকে আসবে?
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ফ্যাক্টওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও ইউল্যাবের মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান।
সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, বিদেশি নম্বর থেকে ওভারস্পিডের জরিমানা পাঠানো এবং টাকা পরিশোধের জন্য ‘.icu’ ডোমেইন ব্যবহার করাই স্পষ্ট সন্দেহের ইঙ্গিত। তার মতে, সরকারি কোনো সংস্থা কখনোই এভাবে আন্তর্জাতিক নম্বর ব্যবহার করে জরিমানার নোটিশ পাঠায় না।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভুয়া ওয়েবসাইটটিতে যেকোনো গাড়ির নম্বর দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি “মামলা” তৈরি হয়ে যায়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিযোগ হিসেবে দেখানো হচ্ছে ‘গতিসীমা অতিক্রম’। জরিমানার পরিমাণ ধরা হচ্ছে ৩ হাজার টাকা। তবে দ্রুত পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে বলা হচ্ছে— তিন দিনের মধ্যে টাকা দিলে মামলা নিষ্পত্তি হবে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতারণার মূল কৌশল দুটি— ভয় এবং লোভ। একদিকে বলা হচ্ছে জরিমানা না দিলে জাতীয় চালক ডেটাবেজ ও ক্রেডিট রেকর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে দ্রুত পরিশোধে বিশেষ ছাড়ের টোপ দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, প্রতারণার ওয়েবসাইটটি দেখতে অনেকটাই বিআরটিএ বা সরকারি প্ল্যাটফর্মের মতো। একই ধরনের লোগো, রঙ ও ডিজাইন ব্যবহার করায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নেই।
ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর ব্যবহারকারীকে পেমেন্ট ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চাওয়া হয় ব্যাংক কার্ডের নম্বর, কার্ডধারীর নাম, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও সিভিভি নম্বর। আর একবার এই তথ্য প্রতারকদের হাতে চলে গেলে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কার্ড ব্যবহার করে অননুমোদিত লেনদেন করা সম্ভব।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল হক বলেন, এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ফিশিং কৌশল। সরকারি সিস্টেমের আদলে তৈরি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষের আস্থা অর্জন করা হচ্ছে, এরপর কৌশলে আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ডোমেইন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতারণার ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত হয়েছে গত ২৩ মে। নেইমসিলো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই সাইটে প্রাইভেসিগার্ডিয়ান সেবার সাহায্যে মালিকের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রক্সি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার্ভারের প্রকৃত অবস্থানও আড়াল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি সংস্থা কখনোই বিদেশি নম্বর বা অচেনা ডোমেইন ব্যবহার করে জরিমানার এসএমএস পাঠায় না। তাই কোনো অচেনা লিংকে প্রবেশ না করা, ডোমেইন যাচাই ছাড়া তথ্য না দেওয়া এবং কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক কার্ড বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য শেয়ার না করাই নিরাপদ।
এআই প্রযুক্তির সুবিধা যখন নগর জীবনে শৃঙ্খলা আনতে কাজ করছে, ঠিক তখনই সেই প্রযুক্তিকেই ভয় ও বিভ্রান্তির অস্ত্র বানিয়ে প্রতারক চক্র ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন আতঙ্ক। একটু অসতর্ক হলেই মুহূর্তে খালি হয়ে যেতে পারে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
