সোমবার, ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চাকরির নামে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, ক্ষেতলাল ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ইমনকে ঘিরে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১১, ২০২৬ ১০:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চাকরি দিয়ে অব্যাহতি, পরে একই পদে নতুন নিয়োগের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যুৎ, সম্পদ ও জ্বালানি বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন—নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি। ফাইল ফটো

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন অফিসার ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা গ্রহণ, সরকারি বিদ্যুৎ ও সম্পদের অননুমোদিত ব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চাকরির প্রতিশ্রুতিতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পর এক ব্যক্তিকে চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং পরে অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে একই পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, চাকরির আশায় অর্থ দিয়ে তাঁরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া সরকারি স্থাপনা সংস্কারের বরাদ্দ, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সরকারি গাছ বিক্রি এবং অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা চেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গত ১০ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশের পরও ইমন মিয়া স্বপদে বহাল রয়েছেন। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা সব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণের দাবি উঠেছে।

চাকরির প্রতিশ্রুতিতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, পরে অব্যাহতির অভিযোগ

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেতলাল উপজেলার বড়বস্তা গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন দাবি করেছেন, ২০২৫ সালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহকারী বাবুর্চি পদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন স্টেশন অফিসার ইমন মিয়া।

তোফাজ্জলের অভিযোগ, চাকরিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর বিভিন্ন অজুহাতে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এমনকি এক মাসের বেতনও তাঁকে দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, অর্থ প্রদান, চাকরি হারানো এবং বেতন না পাওয়াসহ সব মিলিয়ে তিনি প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তোফাজ্জলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানানোর পর স্থানীয়ভাবে চাপ প্রয়োগের একপর্যায়ে তাঁকে এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি অর্থ ফেরত এবং চাকরি পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

এ অবস্থায় বকেয়া অর্থ উদ্ধার, চাকরি ফিরে পাওয়া এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য কিংবা নিয়োগ ও অব্যাহতির নথি প্রকাশিত অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরকারি বিদ্যুৎ ও সম্পদ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ

স্টেশন অফিসার ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি বিদ্যুৎ ও সম্পদের অননুমোদিত ব্যবহার, অবকাঠামো সংস্কারের বরাদ্দে অনিয়ম, সরকারি গাছ বিক্রি এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ দাবির অভিযোগও উঠেছে।

ছামছুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষরিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ফায়ার স্টেশনের ব্যারাকের বিদ্যুতের মিটার থেকে নিজের কোয়ার্টারে সংযোগ নিয়ে সরকারি খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন ইমন মিয়া।

এ ছাড়া স্টেশনের রান্নাঘর ও কোয়ার্টার সংস্কারের নামে সরকারি স্থাপনার ক্ষতিসাধন করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের ঠিকাদার হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমানের ভাই জাহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

একই অভিযোগে সরকারি টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ বিক্রি এবং ২০১৬ সালের মার্চে ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি সরকারি গাছ স্টেশনে এনে পরে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বরাদ্দের নথি, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব, বিক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

একই পদে পুনর্নিয়োগ, চার লাখ টাকা লেনদেনের দাবি

চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের পাশাপাশি একই পদে পুনর্নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তোফাজ্জল হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়ার পর আমিরুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা নিয়ে তাঁকে একই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগটি সত্য হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপত্র, চুক্তি, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং অব্যাহতির কারণ যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগে অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে অতিরিক্ত সময় ও দূরত্ব দেখিয়ে জ্বালানি খাতে প্রায় এক লাখ টাকা বেশি উত্তোলনের কথাও বলা হয়েছে। এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে অগ্নিনির্বাপণ অভিযানের লগবুক, যানবাহনের চলাচলের বিবরণ, জ্বালানি বরাদ্দ এবং ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করা দরকার।

স্টেশনের ছাদে মুরগির খামার, পুকুরে মাছ চাষের অভিযোগ

ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যৌথভাবে পুকুরে মাছ চাষ এবং ফায়ার স্টেশনের চারতলার ছাদে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৪ সেপ্টেম্বর চালক ওয়াসিম, ফায়ার ফাইটার আব্দুল খালেক এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবায়দুলকে দিয়ে মুরগির ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়।

স্টেশনের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে তাঁদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সরকারি স্থাপনা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন, দায়িত্ব বণ্টন এবং সম্পদ ব্যবহারের বিধিবিধান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরও ব্যবস্থা হয়নি—অভিযোগকারীদের দাবি

অভিযোগকারীদের দাবি, গত ১০ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেশন অফিসার ইমন মিয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।

তবে অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক মঞ্জিল হক জানান, তিনি মাসিক রিপোর্ট ফাইলিংয়ের কাজে ক্ষেতলাল স্টেশনে গিয়েছিলেন, কোনো তদন্তের জন্য নয়। ফলে তাঁর ওই সফরকে অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, চাকরির জন্য ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া—দুই পক্ষই সমান অপরাধী। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

নিরপেক্ষ তদন্তেই বেরিয়ে আসুক প্রকৃত সত্য

চাকরির প্রতিশ্রুতিতে অর্থ গ্রহণ, একই পদে পুনর্নিয়োগ, সরকারি বিদ্যুৎ ও সম্পদের ব্যবহার এবং জ্বালানি বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, নিয়োগ ও অব্যাহতির নথি, বিদ্যুৎ বিল, সংস্কারকাজের বরাদ্দ, সরকারি সম্পদ বিক্রির হিসাব এবং যানবাহনের লগবুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে অভিযোগকারী, অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ অনুসন্ধান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

এখন দেখার বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয় কি না এবং তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।