নির্জন সড়কে নিয়ে হত্যার অভিযোগ, বাখরাবাদের জঙ্গল থেকে উদ্ধার আইফোন, তদন্ত অব্যাহত। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে তাজমিনকে ধর্ষণ ও পরে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। হত্যার পর কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার সকাল ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।
ধানক্ষেতের আইলে মিলেছিল মরদেহ
পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর (উত্তরপাড়া) গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ আসে। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম শুরু করে। পরে নিহতের বাবা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্থায়ী ঠিকানা যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলা হওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৩০০ টাকায় ভাড়া, এরপর নির্জন সড়কে
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক হয়।
অটোরিকশায় ওঠার পর কিছু দূর গিয়ে তাজমিন চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনতে বলে। পরে সুমন সংক্ষিপ্ত পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে নির্জন এলাকার দিকে অটোরিকশা চালিয়ে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পালানোর চেষ্টা, চিৎকার; এরপর হত্যার অভিযোগ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্জন ও অন্ধকার স্থানে পৌঁছে সুমন অটোরিকশা থামিয়ে দেয়। জায়গাটি রেসকোর্স নয় বুঝতে পেরে তাজমিন আতঙ্কিত হয়ে অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় সুমন তাকে আটকে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করলে তাজমিন চিৎকার শুরু করে।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা জানিয়েছে। একপর্যায়ে সে গামছা তাজমিনের গলায় পেঁচিয়ে ধরে। ধস্তাধস্তির পর তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে মাথা পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে অভিযুক্ত।
তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এবং মামলার তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া বাকি।
আইফোন নিয়ে পালিয়ে চট্টগ্রামে
পুলিশ জানায়, তাজমিনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে নেয় সুমন। পরে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে ঘটনাস্থলে নিজের অটোরিকশা রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে যায়। সেখানে একটি পুকুরে গোসল করার পর ভাড়ায় চালিত অন্য একটি সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যায়।
পুলিশের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের আইফোনটি লুকিয়ে রেখে সুমন চট্টগ্রামে চলে যায়। পরদিন ৯ অক্টোবর সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্ত অব্যাহত
স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার ও মোবাইল ফোন উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে জব্দ করা অন্যান্য আলামত, ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং মামলার পরবর্তী তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তাজমিন হত্যার ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, প্রয়োজনীয় আলামত পরীক্ষা এবং তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
