জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাজুল ও স্ত্রীর ৩ বছরের কারাদণ্ড, দুজনেরই ১৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা করে জরিমানা। ফাইল ছবি
মাত্র দুই হাজার টাকা বেতনে চট্টগ্রাম ওয়াসায় চাকরি শুরু করেছিলেন মো. তাজুল ইসলাম। সময়ের সঙ্গে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি পেয়ে তা দাঁড়ায় ৩৫ হাজার টাকায়। এরই মধ্যে নগরের রৌফাবাদ এলাকায় তিন শতক জমির ওপর নির্মাণ করা হয় পাঁচতলা ভবন, যেখানে রয়েছে ১৭টি ফ্ল্যাট। কয়েক কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর দীর্ঘ তদন্তের পর এবার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাজুল ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দুজনকেই ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোরারম হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালতের রায় ও জরিমানা
রায়ে তাজুল ইসলামকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ধারায় তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমকেও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া খাইরুন্নেছার বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২৬(২) ধারায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
আদালতের রায়ে বলা হয়, তাজুলের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৬ টাকার ৫০ শতাংশ হিসেবে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্ত্রীকেও একই পরিমাণ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মামলায় এর আগে কোনো কারাবাস হয়ে থাকলে তা সাজার মেয়াদ থেকে বাদ দেওয়ার কথাও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই হাজার টাকা বেতন থেকে ১৭ ফ্ল্যাটের ভবন
আদালত ও দুদক সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে মাত্র দুই হাজার টাকা মাসিক বেতনে চট্টগ্রাম ওয়াসায় হেলপার হিসেবে চাকরি শুরু করেন তাজুল ইসলাম। পরে তিনি গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। পর্যায়ক্রমে তাঁর মাসিক বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার টাকায়। তবে চাকরিজীবনের আয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২২ সালের ৫ মার্চ তাজুল ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০০২ সালে তাজুল ও তাঁর স্ত্রী চট্টগ্রাম নগরের রৌফাবাদ এলাকায় তিন শতক জমি কেনেন। ওই জমির ওপর নির্মাণ করা হয় পাঁচতলা একটি ভবন। ভবনটিতে রয়েছে মোট ১৭টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের তদন্তে খাইরুন্নেছার নামে জমি, ভবনসহ কয়েক কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। তিনি গৃহিণী হওয়ায় এসব সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু করে কমিশন।
নির্মাণব্যয় নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির নির্মাণব্যয়ের অর্ধেক হিসেবে ২৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। তবে দুদকের তদন্তে গণপূর্ত বিভাগের তিন উপপ্রধান প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনটির পরিমাপ করানো হলে নির্মাণব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।
এ ছাড়া খাইরুন্নেছার নামে ব্যাংকে থাকা ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ অর্থসহ বিভিন্ন অস্থাবর সম্পদের তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে দুদক।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাজুলের আয়কে বৈধ হিসেবে দেখাতে তাঁর স্ত্রীকে পোলট্রি খামারের আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখানো হয়েছিল। তবে তদন্তে খাইরুন্নেছার স্বতন্ত্র কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
তিন বছরের তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র
দুদকের প্রায় তিন বছরের তদন্ত শেষে গত বছরের শুরুতে তাজুল ও খাইরুন্নেছার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০২৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
অভিযোগ গঠনের নথিতে বলা হয়, দুজনের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬৫৯ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ উপার্জন, স্ত্রীর নামে জমি ও ভবনে বিনিয়োগ এবং দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ও অন্য মামলার তথ্য
তাজুল ইসলাম চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দীর্ঘদিনের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাজুল ও তাঁর স্ত্রীর এই দণ্ডের রায় এলো। তবে অন্য মামলাগুলোর অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
