রবিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নৌকার ব্যাজ, টেন্ডার বিতর্ক ও একের পর এক অভিযোগ—তবুও তদন্তের অগ্রগতি কোথায়?

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ ৪:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগের নতুন অধ্যায়। ফাইল ছবি

বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমকে ঘিরে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—নৌকার ব্যাজ পরা সেই প্রকৌশলী ফয়সাল আলমকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে?

ঝালকাঠির দায়িত্বকাল নিয়েও অভিযোগ

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা ফয়সাল আলম ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময় নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য ও নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগে তাকে নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে সমালোচনা ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

বরিশালে বদলির পরও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি?

ঝালকাঠি থেকে বরিশালে বদলির পরও একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঠিকাদারদের প্রশ্ন—একই ধরনের অভিযোগ যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে না?

টেন্ডারেই যত প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরিশালের একাধিক মডেল মসজিদসহ কয়েকটি প্রকল্পের দরপত্রে ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকায় এর আগে কিছু দরপত্র বাতিল হয়েছিল।

পরবর্তীতে যৌথ উদ্যোগ বা জেবি (Joint Venture) দেখিয়ে একই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে টেন্ডারের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি নিয়ে প্রশ্ন ছিল, যৌথ উদ্যোগ দেখানোর পর তাদের যোগ্যতা কীভাবে নির্ধারণ করা হলো?

এর উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, জেবি চুক্তি, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি এবং মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত প্রকাশ ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবাদ করলেই লাইসেন্স বাতিলের হুমকি?

বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার গণপূর্ত কার্যালয়ে প্রতিবাদ জানাতে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিরোধিতাকারী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। যদিও এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, কার্যালয়ের নথি এবং প্রয়োজনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়ার দাবি উঠেছে।

ঠিকাদারদের ক্ষোভ

গণপূর্তের সাধারণ ঠিকাদার আব্দুর রহিম বলেন, ঝালকাঠিতে থাকার সময় যেমন অনিয়মের অভিযোগ ছিল, বরিশালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিয়ম ভেঙে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে।

আরেক ঠিকাদার তসলিম মৃধার অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করতেন। এখনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন বলেন, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে—তিনি মূলত সেই প্রশ্নই তুলেছেন। কাউকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য কী?

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম সাংবাদিকদের কাছে উল্টো দাবি করেন, কয়েকজন ঠিকাদার তার কার্যালয়ে এসে তাকে হুমকি দিয়েছেন।

তবে টেন্ডার, রাজনৈতিক পরিচয় এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগসহ সামগ্রিক বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আইইবি কমিটিতেও দায়িত্ব

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), বরিশালের নবগঠিত কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ফয়সাল আলম। এ নিয়েও প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মহলে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরও ব্যবস্থা নেই কেন?

ফয়সাল আলমকে ঘিরে প্রকাশিত সংবাদে নৌকার ব্যাজ পরা ছবি, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, টেন্ডার বিতর্ক, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগসহ নানা বিষয় সামনে এসেছে।

কিন্তু এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্তপূর্বক দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তাদের প্রশ্ন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তরের একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও যদি তদন্ত না হয়, তাহলে সরকারি প্রকল্পের অর্থ, দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?

তদন্তের দাবি আরও জোরালো

সব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি, জেবি চুক্তি, কার্যাদেশ, প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য এবং পূর্বের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

এতে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রশ্নের মুখে বরিশাল গণপূর্ত

নৌকার ব্যাজের ছবি, রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ, টেন্ডার বিতর্ক এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ নেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—

প্রকাশিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কবে?

নাকি অভিযোগের স্তূপ জমতেই থাকবে, আর তদন্ত ও জবাবদিহি থেকে যাবে আড়ালে?

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ