মহিমা মোল্লা (বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়)
প্রেম—যে অনুভূতি মানুষকে সাহসী করে তোলে, অজানা পথেও টেনে নেয় নির্ভয়ে। সেই প্রেমের টানেই ভারতের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক তরুণী, মহিমা মোল্লা, পাড়ি জমিয়েছিলেন সীমান্ত পেরিয়ে চট্টগ্রামে। কিন্তু ভালোবাসার যে গল্প তিনি বুনেছিলেন হৃদয়ে, তা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক বেদনাদায়ক প্রতারণার কাহিনিতে।
জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার জীবনতলা থানার বাসিন্দা মহিমার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় হয় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা রহিমের। ভার্চুয়াল দুনিয়ার সেই পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়—ভিডিও কল, রাতভর চ্যাট আর স্বপ্নে গড়া ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে জড়িয়ে পড়েন তারা। প্রায় দুই বছরের সম্পর্কের পর ভালোবাসার টানে পরিবারকে না জানিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে এসে রহিমকে বিয়ে করেন মহিমা।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। এক বছর সংসার করার পর মহিমা জানতে পারেন, রহিম আগে থেকেই বিবাহিত—রয়েছে স্ত্রী ও সন্তান। ভালোবাসার আড়ালে লুকানো এই প্রতারণা তাকে ভেঙে দেয় ভেতর থেকে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে তিনি সেই সংসার ছেড়ে দেন এবং ফিরে যেতে চান নিজের দেশে, নিজের মানুষদের কাছে।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস—বৈধ কাগজপত্র না থাকায় দেশে ফেরা সহজ হয়নি। অবশেষে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানায় আত্মসমর্পণ করেন মহিমা। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। কারাভোগ শেষে মুক্তি মিললেও নতুন করে আরেক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হন তিনি। এক আত্মীয় পরিচয়ে জিম্মায় নেওয়া ব্যক্তি তাকে দেশে পাঠানোর কথা বলে শারীরিক নির্যাতন ও আপত্তিকর আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
শেষ পর্যন্ত এক মানবাধিকার আইনজীবীর সহায়তায় আদালতের দ্বারস্থ হন মহিমা। আদালত তার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ভারতে ফেরত পাঠানো না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের ফরহাদাবাদের একটি সরকারি সেফ হোমে রাখার নির্দেশ দেন।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মহিমার আর্তি, বিয়ের আগে রহিম তার প্রথম বিয়ের কথা গোপন করেছিলেন। সত্যটা জানলে কখনোই দেশ ছেড়ে আসতাম না। এখন আমি শুধু আমার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রহিমকে বিয়ে করেন মহিমা এবং ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। সাজা শেষে বর্তমানে তিনি সেফ হোমে রয়েছেন, আর চলছে তার দেশে ফেরার প্রক্রিয়া।
প্রেমের মোহে শুরু হওয়া এক গল্প—যেখানে ছিল ভালোবাসার রঙ, স্বপ্নের আলো—শেষ পর্যন্ত তা পরিণত হয়েছে প্রতারণা, বেদনা আর ফিরে যাওয়ার আকুতিতে ভরা এক করুণ বাস্তবতায়।
