১৪তম গ্রেডের চাকরি, অথচ গ্রামে রাজকীয় প্রাসাদ, শহরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট—ঘুষ, কমিশন ও বেনামি ঠিকাদারির অভিযোগ। ফাইল ফটো
সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা থেকে যে আয়, তার সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের যেন কোনো মিলই নেই। ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের উচ্চমান হিসাব সহকারী ও ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে চাকরিকে হাতিয়ার করে ঘুষ বাণিজ্য, কমিশন আদায়, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা এবং সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে তার দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হলেও এর প্রকৃত উৎস নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
প্রায় দুই দশক ধরে একই দপ্তরে কর্মরত জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী। চাকরিজীবনের শুরুতে তার মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা মিলিয়ে বৈধ আয় যতটুকুই হোক, বর্তমানে তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ সেই আয়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
২০ বছরের চাকরি, সম্পদের বিস্ময়কর বিস্তার
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জাহাঙ্গীর আলম গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ঘুষ ও কমিশন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কাজের বিল পাসের ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়মিতভাবে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। শুধু বিল পাস নয়—প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন, নতুন লাইসেন্স ইস্যু এবং দাপ্তরিক বিভিন্ন কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কেউ কথিত এই কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার কারণে জাহাঙ্গীর আলম দপ্তরের ভেতরে এমন একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, যার বাইরে গিয়ে অনেক কাজ করাই কঠিন। তার দাবি, এই প্রভাববলয়ের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়।
সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে লাইসেন্স নবায়ন ফি, ইজিপি চালুর আগের সময়ের সিডিউল ফিসহ সরকারি খাতের বিভিন্ন রাজস্বের কয়েক লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন লাইসেন্স ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কামারখালীতে চারতলা ‘রাজকীয় প্রাসাদ’
জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদের চিত্র যেন তার গ্রামের বাড়িতে গেলেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল চারতলা বাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটির নির্মাণ ও বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
বাড়িটির নির্মাণশৈলী, আয়তন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দেখে স্থানীয়দের অনেকেই এটিকে ‘রাজকীয় বাড়ি’ বলে অভিহিত করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও দাবি, জাহাঙ্গীর আলম নিজের এবং স্ত্রীর নামে কামারখালী ও আশপাশের এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কিনেছেন। এসব জমির মোট পরিমাণ ও বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তবে জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও মালিকানা যাচাই করতে স্থানীয় ভূমি অফিসে তথ্যের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফরিদপুর শহরেও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদের বিস্তার শুধু গ্রামের বাড়ি ও জমিতেই সীমাবদ্ধ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফরিদপুর শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন ১০ তলা ভবন ‘বর্ণমালা’র ৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার ৫-এর ‘সি’ ইউনিটে তার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে। ভবনের দারোয়ান কুদ্দুস শেখ জানান, জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
বেতন একদিকে, সম্পদের পাহাড় অন্যদিকে
সরকারি চাকরির ১৪তম গ্রেডের স্কেল অনুযায়ী ১০ হাজার ২০০ টাকা মূল বেতনে চাকরিতে যোগ দেন জাহাঙ্গীর আলম। সেই হিসাবে কেবল প্রাথমিক মূল বেতন ধরে ২০ বছরে তার আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পরবর্তীতে বেতন বৃদ্ধি, ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয় যুক্ত হলে এই পরিমাণ আরও বাড়বে।
কিন্তু তার দৃশ্যমান সম্পদ, বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সঙ্গে এই বৈধ আয়ের তুলনা করলে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যায় বলে অভিযোগ।
এত স্বল্প বৈধ আয়ের বিপরীতে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে অর্জিত হলো—সম্পদের উৎস কী, কার নামে কত সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদ কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
‘বেনামি সম্পদ’ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, জাহাঙ্গীর আলম নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ও স্বজনদের নামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন। কিছু সম্পদ বেনামে কিংবা অন্যের নামে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও দাবি করেছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি যে আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, তার প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে তার সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ফ্ল্যাট ক্রয়ের নথি এবং ঠিকাদারি সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাই করা জরুরি।
বক্তব্য দিতে জাহাঙ্গীরের অনীহা?
অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুজ্জামান সবুজের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের একজন ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত বিপুল সম্পদ ও ঘুষ-কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তদন্তের মুখোমুখি হলে কি খুলবে জাহাঙ্গীর আলমের কথিত সম্পদ সাম্রাজ্যের আসল রহস্য?—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ফরিদপুরের গণপূর্ত অঙ্গনে।
