সরকারি সেবার দরজায় এসে দাঁড়ালেই যেন শুরু হয় এক অদৃশ্য লড়াই—যেখানে নিয়ম, আইন আর স্বচ্ছতা হার মানে দালালচক্রের কৌশলী জালে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ভাবখালী-ঘাগড়া ইউনিয়নের একমাত্র ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এমনই এক অন্ধকার সাম্রাজ্য, যেখানে অভিযোগের পরও থামেনি অনিয়মের অশুভ ছায়া।
ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের দাপট আর সাধারণ মানুষের অসহায়তার গল্প এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ আর হতাশা যেন দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নামজারি, খতিয়ান, পর্চা, জমি খারিজ কিংবা আরওআর খসড়া—যে সেবার জন্যই আসা হোক না কেন, দালালের ফাঁদ এড়িয়ে পথ চলা যেন অসম্ভব। সরকারি ফি জমা দিয়েও কাজ এগোয় না, বরং ফাইল আটকে রেখে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। আর সেই অচলাবস্থার মাঝেই দালালদের ‘সমাধানের হাতছানি’—যেন অন্ধকারে এক বিভ্রান্তিকর আলো।
এদিকে ভুক্তভোগীদের ভাষ্যে উঠে আসে এক নীরব যন্ত্রণা— অভিযোগ করলে লাভ নেই, উল্টো কাজ আরও আটকে যায়। তাই অনেকে বাধ্য হয়েই দালালের দ্বারস্থ হন, নিজের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দেন দ্রুত সেবার আশায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভূমি অফিসের সামনে সকাল থেকেই অবস্থান নেয় কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি। তারা নিজেদের “সহযোগী” বা “কম্পিউটার দোকানের লোক” পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে কাছে টেনে নেয়, তারপর দ্রুত সেবা দেওয়ার প্রলোভনে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
অভিযোগ রয়েছে, জমির ধরন ও সেবার ওপর নির্ভর করে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষক, প্রবাসীর পরিবার ও ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে অজ্ঞ মানুষজনই সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন এই প্রতারণার।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—ভূমি অফিস সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই সিন্ডিকেট। আবেদনপত্র পূরণ, কাগজপত্র সংগ্রহ ও খসড়া তৈরির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই দোকানগুলোর সঙ্গে অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তির অদৃশ্য যোগাযোগ রয়েছে, যার ফলে ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পরে দালালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির পথ দেখানো হয়।
এছাড়াও তাসলিমা নামের এক বহিরাগত নারীকে ঘিরেও উঠেছে অর্থ আদায়ের অভিযোগ। আরওআর খসড়া ও মাঠ পর্চার ফটোকপির নামে কয়েকশ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের বিষয়টি স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মূল নথি না দেখিয়ে শুধু ফটোকপি দেওয়া হচ্ছে—যা ভবিষ্যতে জালিয়াতির ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কয়েকজন চিহ্নিত দালালের নামও—রফিকুল, সজিব, জুম্মন, রিদয়, আব্দুল্লাহ ও খালেকসহ আরও অনেকে। স্থানীয়দের দাবি, তারা প্রতিদিন অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের প্রভাবিত করে এবং দালালের কাছে যেতে বাধ্য করে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভূমি অফিসের নায়েব লুৎফর রহমান। তার দাবি, তিনি বরং দালালদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং অফিসে তাদের প্রবেশ ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—টিনের গেট থাকলেও দালালদের উপস্থিতি কমেনি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে—যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তবে এখনো কীভাবে দালালরা প্রকাশ্যে সক্রিয়? প্রশাসনের চোখের সামনে এমন এক সিন্ডিকেট কীভাবে দিনের পর দিন টিকে থাকে?
আবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি তদন্তের আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে। সচেতন মহলের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। নিয়মিত অভিযান, সিসিটিভি স্থাপন, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এই দুর্নীতির জাল ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ, এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ—যারা সরকারি সেবা নিতে এসে হারাচ্ছেন সময়, অর্থ এবং আস্থা। তাদের একটাই দাবি—
স্বচ্ছতা ফিরুক,দালালমুক্ত হোক ভূমি অফিস—নইলে ফাইলের সঙ্গে সঙ্গে আটকে থাকবে মানুষের স্বপ্নও।
