সোমবার, ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফেসবুকে পরিচয়, প্রেমের টানে কক্সবাজার, ফিরেই মর্মান্তিক পরিণতি: তাজমীন হত্যার নেপথ্যে যা জানা গেল

কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ১১, ২০২৬ ১১:৫১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজুর সঙ্গে দেখা করতে কক্সবাজারে গিয়েছিল স্কুলছাত্রী, ফেরার পথে সিএনজিচালক সুমনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ। আদালতে স্বীকারোক্তির কথা জানিয়েছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেমের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে জান্নাতুন তাজমীনকে ফুঁসলিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজু চৌধুরীর বিরুদ্ধে। কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করতেন রাজু। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে কক্সবাজারে যাওয়া স্কুলছাত্রী তাজমীন ফেরার পথে কুমিল্লায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার তথ্যও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কুমিল্লার এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তাজমীনের কক্সবাজার যাত্রা, ফেসবুকে পরিচয়, পরিবারের সঙ্গে শেষ কথোপকথন এবং হত্যার আগের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। জেলা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি ছাড়ে তাজমীন

তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমীন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমীন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন এবং সব সময় চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ তাঁর।

ফেসবুকের পরিচয় থেকে কক্সবাজার যাত্রা

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করতেন রাজু চৌধুরী। ফেসবুকের মাধ্যমে তাজমীনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে রাজুর সঙ্গে দেখা করতে কক্সবাজারে যায় ওই কিশোরী।

সূত্র জানায়, ৪ আগস্ট তাজমীন বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারে যায়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা জানিয়েছিল সে।

এদিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার যাত্রার বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের কক্স প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে তাজমীন তার বন্ধু রাজুকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের কাউন্টারে আসে। পরদিন কুমিল্লায় ফেরার জন্য তারা বাসের টিকিট কাটে।

আবদুল্লাহ বলেন, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রাতে বাসটি কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানে পৌঁছায়।

তিনি আরও জানান, ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর তাঁরা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে তাজমীনের উপস্থিতির ভিডিও সংরক্ষণ করেছেন। পুলিশ চাইলে যেকোনো সময় সেই ফুটেজ সরবরাহ করা হবে।

সিসিটিভি ফুটেজে বাস থেকে নামার দৃশ্য

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা প্রবেশমুখ পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে তাজমীনকে নামতে দেখা যায় বলে সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে জানানো হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস থেকে নামার পর শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। এরপরই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা।

অটোরিকশাচালক সুমনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন—সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। পুলিশের দাবি, তিনি তাজমীনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনায় তাঁর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

তবে ঘটনার প্রতিটি দিক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অপরাধের পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ, সম্পৃক্ততা মেলেনি

তাজমীনের মা যে বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বান্ধবী তাজমীনের চেয়ে বয়সে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে তাঁর বা অন্য কোনো বান্ধবীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, তাজমীন মোবাইল গেমে আসক্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাবজি বা ফ্রি ফায়ারের মতো গেম খেলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা প্রতিষ্ঠিত নয়।

চঞ্চল স্বভাবের তাজমীন, পরিবারের প্রতি ছিল দায়িত্ববোধ

তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমীনকে পড়িয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমীন ছিল খুব চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনাও করত সে।

শিক্ষক জানান, তাজমীনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন তিনি। রাগ হলে তাজমীন হুটহাট বাসা থেকে বের হয়ে যেত বলেও জানান ওই শিক্ষক।

তদন্তে সামনে আরও প্রশ্ন

তাজমীনের কক্সবাজার যাত্রা, রাজুর সঙ্গে সম্পর্ক, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের কাছে দেওয়া তথ্য এবং কুমিল্লায় ফিরে অটোরিকশায় ওঠার পরের ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছুই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একদিকে মেয়েকে হারিয়ে শোকাহত পরিবার, অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের অপেক্ষা। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন মিয়াকে এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ঘটনার সব দিক যাচাই, প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাজমীন হত্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।