পুলিশ-প্রশাসনকে না জানিয়ে অভিযানে মারধরের অভিযোগ, বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
রাজধানীতে মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বরিশালে প্রশ্নবিদ্ধ মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে আলোচনায় এসেছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নগরীর আমানতগঞ্জ বক্ষব্যাধি (টিবি) হাসপাতাল মাঠে অভিযান চালিয়ে মাদক সেবনের অভিযোগে কয়েকজন যুবককে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গত মঙ্গলবার রাতের এ অভিযানের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযানের ভিডিও ফেসবুক লাইভে প্রচারিত হওয়ার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের অভিযান চালানোর আইনগত এখতিয়ার, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফেসবুক লাইভে ধরা পড়ল মারধরের দৃশ্য
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব নাভিদ তুষারসহ ৮ থেকে ১০ জন সঙ্গীকে নিয়ে আমানতগঞ্জ টিবি হাসপাতাল মাঠে যান মনিরুজ্জামান ফারুক। তাঁর বাসাও ওই মাঠের কাছাকাছি এলাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় এই মাঠে সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। মাঠটির চোখে দেখা দূরত্বেই রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়। কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ফারুকের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা মাঠের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক সেবনের অভিযোগে কয়েকজন যুবককে ধরে নিয়ে আসছেন। এ সময় ফারুককে কয়েকজনকে থাপ্পড় দিতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজনের কাছ থেকে প্লাস্টিকের পাইপ নিয়ে এক যুবককে পেটানোর দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা গেছে।
তবে ভিডিওতে যাদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগের সত্যতা কিংবা তাঁদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চারজনকে আটকের দাবি ছাত্রদল নেতার
অভিযানে অংশ নেওয়া মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব নাভিদ তুষার বলেন, একই এলাকায় অবস্থিত বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, নির্মাণাধীন শিশু হাসপাতাল এবং বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে তাঁরা অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করেন। পরে স্থানীয়দের অনুরোধে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
তুষারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই এলাকার বাসিন্দা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুকের কাছে স্থানীয়রা মাদকসেবীদের উপদ্রবের বিষয়ে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ফারুক এ অভিযান পরিচালনা করেন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পৃক্ত না করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘আইনবহির্ভূত’ বলছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
এ ধরনের অভিযানের আইনগত এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু আল রায়হান। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া এ ধরনের অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার অন্য কারও নেই। বিএনপি নেতা ফারুক যা করেছেন, তা পুরোপুরি আইনবহির্ভূত।
আইনজীবীর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাউকে আটক করা, শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া এবং পরে ছেড়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের আইনগত সীমা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি, তবু নিয়ন্ত্রণে নেই মাদকসেবীদের আড্ডা?
অভিযানস্থলের কাছেই আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি। তারপরও সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা চলার অভিযোগ স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রেজাউল ইসলাম রেজা জানান, বিএনপি নেতাদের এ অভিযানের বিষয়ে তাঁদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। পরে তাঁরা বিষয়টি শুনেছেন।
ফাঁড়ির কাছাকাছি এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে থাকে।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশালের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অভিযান চালাতে পারেন না।
তিনি স্বীকার করেন, টিবি হাসপাতাল মাঠটি অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় সেখানে মাদকসেবীদের উপদ্রব রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদকসেবীদের এমন আনাগোনা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
ফারুকের যুক্তি: পুলিশকে ডাকলে উল্টো ঘটনা ঘটতে পারত’
নিজের উদ্যোগে অভিযান চালানোর বিষয়ে মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, তিনি নিজের এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ছেড়ে দেয়। এ কারণে তিনি তাঁদের পুলিশে না দিয়ে উত্তমমাধ্যম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া অভিযান চালানোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফারুক বলেন, পুলিশ কী করে, তা সবাই জানে। তাঁদের ডাকলে আবার উল্টো ঘটনা ঘটতে পারত।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁর এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা, তাঁদের মারধরের প্রয়োজনীয়তা কিংবা তাঁদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে না দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক মো. কামাল হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মাদকবিরোধী অভিযান, নাকি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া?
মাদকসেবীদের উপদ্রব বন্ধে স্থানীয়দের উদ্যোগ ও উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু অপরাধের অভিযোগে কাউকে আটক করা, জিজ্ঞাসাবাদ করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে কাউকে মারধর করার অভিযোগ উঠলে তা কেবল মাদকবিরোধী তৎপরতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
বরিশালের আমানতগঞ্জে বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান ফারুকের এ অভিযান তাই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে মাদকসেবীদের উপদ্রব বন্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে অভিযান ও মারধরের অভিযোগ—দুইয়ের মধ্যে আইনসম্মত সমাধান নিশ্চিত করাই এখন বড় প্রশ্ন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে টিবি হাসপাতাল মাঠসহ আশপাশের এলাকায় মাদকসেবীদের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হবে।
