সোমবার, ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাকেরগঞ্জে শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ

বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
অক্টোবর ১১, ২০২৬ ৪:২০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বদলি-ডেপুটেশন থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি—ফাইল আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ, স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দেও অনিয়মের প্রশ্ন। ফাইল ছবি

শিক্ষকদের বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তিতে ঘুষ দাবি, প্রশাসনিক হয়রানি এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, অর্থ না দিলে অনেক ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখা হয়, প্রতিবাদ করলে দেওয়া হয় কারণ দর্শানোর নোটিশ। এমনকি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক শিক্ষিকার মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।ঔ অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা পেতে আর্থিক লেনদেনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া তাঁর স্ত্রী ও ছোট ভাই নুরুলের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শিক্ষকদের হয়রানি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটার হোটেল জননীসহ বরিশালের বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে। তাঁর কথিত অবৈধ ও আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে আগে প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এবার সামনে এসেছে শিক্ষক হয়রানি, বদলি-ডেপুটেশন বাণিজ্য এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ।

মাতৃত্বকালীন ছুটিতেও ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ

ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বদলি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন, পেনশন এবং ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তাঁদের নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ছাড়া প্রয়োজনীয় ফাইল এগোয় না বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। প্রতিবাদ করলে চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করা কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে দাবি কয়েকজন শিক্ষকের।

এক শিক্ষিকার অভিযোগ, ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশের মুখে পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। এরপর ওই টাকা দিয়ে ছুটি নিতে হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

একজন শিক্ষকের প্রাপ্য ছুটি পেতে এ ধরনের আর্থিক চাপের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

ডেপুটেশন পেতে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা?

শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেপুটেশন বা সাময়িক সংযুক্তি পেতে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগের তালিকায় সাতানিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলীম ইবনাতকে পৌরসভা বিদ্যালয়ে, শাকবুনিয়ার জাকারিয়াকে লক্ষ্মীপাশা আমিনিয়া বিদ্যালয়ে, গারুড়িয়ার শারমিন আক্তারকে দেউলি বিদ্যালয়ে, মতিউর রহমান বিদ্যালয়ের শিবশংকর দাসকে খেজুরা ভরপাশা বিদ্যালয়ে এবং পোড়াচিপার আমিনুল ইসলামকে দক্ষিণ দাওকাঠি বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জান্নাতুন ফেরদৌসি, লাইজু আক্তার, ইতি আক্তার, সাথী আক্তার, সোনিয়া আক্তার, জামিল আক্তার, আনিকা ইবনাত, কাকলী দে ও নাসরিন সুলতানাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব সংযুক্তির ক্ষেত্রে বিধিবিধান লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদেশ ও প্রশাসনিক নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০-৪০ শতাংশ কাটার অভিযোগ

শুধু বদলি ও ডেপুটেশন নয়, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের দাবি, বিদ্যালয় পর্যায়ের স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

পাশাপাশি তিন-চার বছর আগের ফাইল পুনরায় সামনে এনে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকদের চাপে রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়। তবে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ বা কেটে রাখার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, ব্যয়ের হিসাব, ভাউচার ও আর্থিক রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কয়েকজনের নাম

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কয়েকজন ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাঁদের অভিযোগে সাবেক শিক্ষক সেলিম, সহকারী শিক্ষক সালেহীন শিকদার এবং প্রধান শিক্ষক পরশের নাম এসেছে। তবে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বাকেরগঞ্জের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁরা এসব অভিযোগ নিয়ে দুদক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা হোক এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কারণে কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি কর্মকর্তা

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া নয়, শিক্ষকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারক করা এবং সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। ফলে এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বাকেরগঞ্জের শিক্ষকদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। একই সঙ্গে বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিদ্যালয়ের বরাদ্দসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে, যাতে শিক্ষকরা হয়রানি ছাড়াই তাঁদের ন্যায্য সেবা পান।

সাম্প্রতিক এসব অভিযোগ ও পরবর্তী তথ্য এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……………

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।