মেহেদী হাসান বিপু
রাজধানীর উত্তর বাড্ডার পোস্ট অফিস পাড়ার একটি বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। অভিযানে মেহেদী হাসান বিপু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
গত বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিপুর বাসায় অভিযান চালানো হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, অভিযানে ওই বাসা থেকে ৭টি পিস্তল, ৩টি রিভলবার, ১টি রাইফেল, ২টি এয়ারগানসহ মোট ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ৩৯৪ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৩০টি কার্তুজ, বিপুল পরিমাণ এয়ারগান প্যালেট, ম্যাগাজিন, ওয়াকিটকি, ধারালো অস্ত্র, দূরবীন এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে।
আইএসপিআরের ভাষ্য, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এসব অবৈধ অস্ত্র গোপনে মজুত করেছিলেন বিপু। তবে অপরাধ জগতের সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিল বিপু।
পুলিশ সূত্র জানায়, মেহেদী হাসান বিপু দীর্ঘদিন ধরে রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, বারিধারা ও গুলশান এলাকায় সুব্রত বাইনের হয়ে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। বাড্ডা, গুলশান ও বারিধারা এলাকায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সন্ত্রাসী মেহেদী কলিন্স ও গোলাম মর্তুজা বাবু বিপুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো ভাড়ায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্রের কাছে সরবরাহ করা হতো কি না, তা তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সুব্রত বাইনের ‘নেটওয়ার্ক’ পুলিশ জানায়, গত বছরের মে মাসে কুষ্টিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাজধানীর অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নেয় মেহেদী হাসান বিপু। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
সূত্র অনুযায়ী, সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবু, সোহেল ওরফে কান্নি সোহেলসহ আরও কয়েকজন কাজ করতেন। গত এক বছরে এসব চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে সুমন নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বড় সাঈদ গ্রেপ্তার হন, যদিও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিপুর সঙ্গে বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার ভাই আলমগীরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার- পুলিশ বলছে, ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠেন সুব্রত বাইন। প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন তিনি। মেরুল বাড্ডার একটি মাছের আড়ত থেকেই প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। সুব্রত বাইন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই আড়তসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নেন মেহেদী হাসান বিপু।
মামলা ও পরবর্তী পদক্ষেপ-বাড্ডা থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) আজহারুল ইসলাম জানান, বিপুকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। শনিবার তাকে আদালতে তোলা হবে। সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, শরীয়তপুর ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে একের পর এক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি অভিযানে এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে এবং হাজারো চিহ্নিত সন্ত্রাসী আটক হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের লুট হওয়া বিপুল অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
