মঙ্গলবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত আনোয়ার, চাকরির নতুন অধ্যায়ের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না, দুই শিশুকে রেখে নিভে গেল জীবনের আলো

বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি
অক্টোবর ২০, ২০২৬ ৯:৫৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বামে আনোয়ার হোসেন ও ডান থেকে প্রথমে ফাতেমা বেগম। ফাইল ছবি

ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে তিন মাস বেতন না পেয়ে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন (৩০)। নতুন কর্মস্থল ‘ইটিপি প্লান্ট’ কোম্পানির প্রথম কাজেই গিয়েছিলেন বরিশাল। কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন নতুন চাকরির আনন্দ আর পরিবারের কাছে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন তিনি। ঘরে অপেক্ষায় থাকা পাঁচ বছরের মেয়ে হাফসা আর এক বছরের কম বয়সী ছেলে হুজাইফকে রেখে চিরবিদায় নিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

স্বামীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে দিশেহারা স্ত্রী ফাতেমা বেগম। দুই ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাকি জীবন কাটাবেন, সেই ভাবনায় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। অন্যদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা বাবর আলীর চোখেমুখে এখন শুধুই অসহায়ত্ব। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তছনছ করে দিয়েছে পুরো পরিবারটির ভবিষ্যৎ।

বনপাড়ায় ভোরের সংঘর্ষ, প্রাণ গেল অন্তত ১৪ জনের

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর পাঁচটার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বড়াইগ্রামের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন।

নাটোরের বড়াইগ্রাম থানা সূত্রে জানা যায়, আরপি পরিবহনের একটি বাস বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে নাটোর, রাজশাহীসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার চাইপাড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন।

স্বামীর মরদেহ গোসল করিয়ে শেষ বিদায়

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আনোয়ারের চাইপাড়া গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবার বাড়ি থেকে ছুটে আসেন ফাতেমা বেগম। দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁকে বারবার অসুস্থ করে তুলছিল। শোকের মধ্যেও নিজের হাতে স্বামীর মরদেহ গোসল করিয়ে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নেন তিনি।

ফাতেমার ভাষ্য, দুর্ঘটনায় আনোয়ারের একটি চোখ উঠে গেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল ক্ষতচিহ্ন। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের কারণেই ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

আনোয়ারের মরদেহ আনতে নাটোরে গিয়েছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই আকতার হোসেন। তিনি সমকালকে জানান, আনোয়ারের কিছু জিনিসপত্র খোয়া গেছে। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করা হলেও কেউ রিসিভ করছেন না। পরে তিনি মরদেহ নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।

মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে আনোয়ারের মরদেহ দাফন করা হয়।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা বৃদ্ধ বাবা

আনোয়ারের মৃত্যুতে শুধু স্ত্রী-সন্তান নয়, ভেঙে পড়েছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা বাবর আলীও। পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন সংসার চালানো এবং নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবর আলী বলেন, ‘এখন আমার সংসার কিভাবে চলবে। নাতি-নাতনিগুলোও কিভাবে মানুষ হবে। অল্প বয়সী ছেলের বউ কিভাবে বাকি জীবন পার করবে।

আনোয়ারের শ্বশুর নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর মেয়ে ফাতেমা বাবার বাড়িতেই থাকতেন। শহিদুল নামে আনোয়ারের এক ভাতিজা তাঁকে প্রথম ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ভাতিজার কাছ থেকেই জামাইয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তাঁরা। পরে মেয়েকে নিয়ে একই উপজেলার আনোয়ারের চাইপাড়া গ্রামের বাড়িতে আসেন।

পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর, থানায় ইউডি মামলা

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আনোয়ারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর পরিবারকে জানানো হয়। পরে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করা হয়েছে।

নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের জন্য নতুন করে স্বপ্ন বুনছিলেন আনোয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তাঁর জীবন। রেখে গেল অসহায় স্ত্রী, দুই অবুঝ সন্তান আর এক বৃদ্ধ বাবাকে—যাঁদের জীবনে এখন প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।