বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের কার্যক্রম ঘিরে নতুন করে উঠেছে অর্থ লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)-এর কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম রনি।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি ও চার্জের বাইরে অর্থ গ্রহণের মতো গুরুতর অভিযোগের সমর্থনে তাদের কাছে রয়েছে দুটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ফুটেজ। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগে উত্থাপিত কোনো বিষয়ই এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। ভিডিওতে দেখা অর্থের প্রকৃতি কী, সেটি বৈধ কোনো লেনদেনের অংশ কি না, অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তি কে এবং ওই অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাপ্তরিক দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে।
দুই ভিডিওতেই কী আছে—উঠছে একাধিক প্রশ্ন
বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে অভিযোগকারী পক্ষ দুটি ভিডিওর সময়, দৈর্ঘ্য ও নির্দিষ্ট অংশের তথ্য তুলে ধরেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২১ জুন ২০২৬ দুপুর ১টা ২২ মিনিটে ধারণ করা প্রথম ভিডিওটির পূর্ণ দৈর্ঘ্য ১৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড। ভিডিওটির ১২ মিনিট ৮ সেকেন্ডের অংশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একজনের কাছ থেকে টাকার বান্ডিল সদৃশ অর্থ গ্রহণ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে ওই অর্থকে সরাসরি ঘুষ বা অবৈধ অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং অর্থের উৎস, উদ্দেশ্য ও লেনদেনের সঙ্গে দাপ্তরিক কাজের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ৬ মে ২০২৬ দুপুর ১টা ১১ মিনিটে ধারণ করা দ্বিতীয় ভিডিওটির পূর্ণ দৈর্ঘ্য ১০ মিনিট ২২ সেকেন্ড বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ভিডিওটির ৩ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির একটি বক্তব্য ধারণ করা হয়েছে।
তবে বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী ছিল, সেটি সম্পাদিত বা বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ কি না এবং বক্তব্যটির প্রকৃত অর্থ কী—এসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারী পক্ষ মনে করছে। তাই শুধু নির্দিষ্ট অংশ নয়, দুটি ভিডিওর মূল ও পূর্ণাঙ্গ ফুটেজ পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
ভিডিওর পাশাপাশি সিসিটিভি ও ডিজিটাল রেকর্ডেও নজর
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শুধু ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সময়ের অন্যান্য দাপ্তরিক ও ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আবেদনে সংশ্লিষ্ট সময়ের—
সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও যাচাই,
অফিসিয়াল সফটওয়্যার ও সিস্টেম লগ পরীক্ষা,
আবেদন ও সেবা প্রদানের রেকর্ড যাচাই,
সংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা,
অফিস উপস্থিতি ও ডিউটি রোস্টার পর্যালোচনা
করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কারণ কোনো ভিডিওর বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে একই সময়ের সিসিটিভি, সফটওয়্যার লগ, দাপ্তরিক নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে ভিডিওর তথ্য মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে অধিক নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।
প্রায় এক যুগ একই কর্মস্থলে?
অভিযোগপত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দীর্ঘদিন ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনের দাবি।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, গত প্রায় ১২ বছরের কর্মস্থল, পদায়ন, বদলি ও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ জন্য নিয়োগপত্র, পদায়ন ও বদলির আদেশ, দায়িত্ব অর্পণের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের দাপ্তরিক রেকর্ড যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
বাস্তবে তিনি কত বছর ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালন করেছেন, কোন কোন পদে ছিলেন এবং কোন কোন সরকারি আদেশের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেই পাওয়া সম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি
অর্থ গ্রহণ, ভিডিও ফুটেজ, দীর্ঘদিনের পদায়ন ও দায়িত্ব পালনের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোঃ শফিকুল ইসলাম রনির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো পূর্ণাঙ্গ, স্পষ্ট ও প্রকাশযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে সংক্ষিপ্ত মৌখিক বক্তব্যে তিনি বলেন, আগামী কয়েক মাস পর, আমাদের প্রজেক্টের মেয়াদও শেষ। আর ঝামেলা হলে চাকরিই ছেড়ে দেবো…! প্রায় একটা যুগেরও বেশি এখানেই (ময়মনসিংহ) চাকরি করলাম! এখন অন্য পথ বেছে নেবো।
তাঁর এই বক্তব্যে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, ভিডিওতে প্রদর্শিত অর্থের প্রকৃতি, অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তির পরিচয় কিংবা ওই লেনদেনের সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক দায়িত্বের সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একইভাবে, ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে উঠে এলেও ঠিক কত বছর, কোন কোন পদে এবং কোন কোন সরকারি আদেশের ভিত্তিতে তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি দেননি।
১০ দফা দাবিতে তদন্তের আবেদন
বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া আবেদনে অভিযোগকারী পক্ষ মোট ১০ দফা দাবি জানিয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অভিযোগটি জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা; দুটি ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ ও মূল ফুটেজ যাচাই করা; ভিডিওর ডিজিটাল সত্যতা, সময় ও প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা; সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও যাচাই করা; অফিসিয়াল সফটওয়্যার, সিস্টেম লগ ও লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রায় ১২ বছরের পদায়ন ও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস যাচাই করা।
এ ছাড়া তদন্ত চলাকালে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, তদন্তে দুর্নীতি বা অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্তের অগ্রগতি অভিযোগকারীকে অবহিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন—ভিডিও নয়, প্রমাণের সঙ্গে ভিডিওর মিল কতটা?
অভিযোগগুলো গুরুতর হলেও এগুলো এখনো অভিযোগমাত্র। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি তথ্য ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে দুটি ভিডিওর মূল ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি, অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি, অফিসিয়াল সফটওয়্যার ও লেনদেনের রেকর্ড এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার পদায়ন-বদলির ইতিহাস পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
জনস্বার্থে উত্থাপিত এ অভিযোগের ক্ষেত্রে তাই মূল প্রশ্ন শুধু “ভিডিওতে কী দেখা যাচ্ছে?—তা নয়। বরং ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে দাপ্তরিক রেকর্ড, সিসিটিভি, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মিল কতটা—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য বা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হলেও সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সুতরাং, এখন সবার নজর দুটি ভিডিওর মূল ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি, দাপ্তরিক ও ডিজিটাল রেকর্ড এবং পদায়ন-বদলির নথির দিকে। এসব তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাইই শেষ পর্যন্ত বলে দিতে পারে—অভিযোগের আড়ালে প্রকৃত ঘটনা কী।
