ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান-ছবি: সংগৃহীত
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই ‘লুটের ছক’ বাস্তবায়নকারী। ব্যাংকিং খাতকে জিম্মি করে পরিকল্পিত ঋণ জালিয়াতি ও শত শত কোটি টাকা লুটের অভিযোগে ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, তার পরিবার ও সহযোগী কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে। এই মামলায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সরাসরি আসামি করা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়—বরং ব্যাংক–করপোরেট যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ ঋণ লুটপাট সিন্ডিকেট।
অপর্যাপ্ত জামানতে শত শত কোটি টাকা: নিয়ম ছিল শুধু কাগজে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অপর্যাপ্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ জামানতের বিপরীতে ওরিয়ন গ্রুপের দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেন। ব্যাংকিং নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই দ্রুতগতিতে ঋণ ছাড় করা হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ— অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বৈদেশিক মুদ্রার ঋণকে বেআইনিভাবে ডমেস্টিক ইউনিটে রূপান্তর, নতুন করে মেয়াদি ঋণ সৃষ্টি এবং কৃত্রিমভাবে ঋণের মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে গ্রাহক শ্রেণিকরণ ও খেলাপির দায় এড়িয়ে যেতে পারে।
ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই পুনঃতফসিল, আত্মসাৎ ৫০৭ কোটি টাকা– এজাহারে বলা হয়েছে, ঋণের ডাউন পেমেন্ট যথাযথভাবে পরিশোধ না করেও বারবার পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ সুবিধা বাতিল ও শ্রেণিকরণের কথা থাকলেও তা না করে নতুন ঋণ সৃষ্টি করে পুরনো ঋণ ঢাকার কৌশল নেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
ব্যাংকের ভেতরেই ছিল সহায়তার দেয়াল
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নন—
ব্যাংকের সাবেক এমডি ও সিইও, চিফ রিস্ক অফিসার, ডেপুটি এমডি, ভাইস প্রেসিডেন্ট, ক্রেডিট ইনচার্জ ও শাখা প্রধানরাও রয়েছেন।
দুদকের মতে, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নথি যাচাই ও অনুমোদন—সব স্তরেই ছিল পরিকল্পিত অবহেলা, যা ছাড়া এত বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি সম্ভব নয়।
নথিতে নথিতে অনিয়মের পাহাড়–
এজাহারে যেসব ভয়াবহ অনিয়ম উঠে এসেছে—
বোর্ড রেজ্যুলেশন ছাড়াই করপোরেট গ্যারান্টি গ্রহণ
বন্ধকি সম্পত্তি সরকারের অধিগ্রহণে আছে কি না, তা যাচাই না করা
প্যানেল আইনজীবী ও সার্ভেয়ার সনদের অনুপস্থিতি
খাজনা রশিদ ও দলিলের অনলাইন যাচাই না করা
ইন্স্যুরেন্স পলিসিতে ব্যাংকের নাম না থাকা
দুদকের দাবি, এসব অনিয়ম ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে টাকা উদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় সত্যতা মিলেছে। এই অভিযোগগুলো শুধু দুদকের নয়—
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনেও একই ধরনের গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা মামলাটিকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
সম্পদের হিসাব চেয়েছে দুদক।
এদিকে মামলার পাশাপাশি ওরিয়ন চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম ও তার স্ত্রী আরজুদা করিমের নামে-বেনামে অর্জিত সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস দিয়েছে দুদক। তাদের সম্পদের উৎস ও মানিলন্ডারিংয়ের যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
